সুনামগঞ্জ
সুনামগঞ্জে হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা প্রদান
অতিবৃষ্টিপাতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সহায়তা তুলে দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে জেলার খরচার হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের হাতে সহায়তা তুলে দিয়ে তিন মাসব্যাপী সহায়তা কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।
এর আগে, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউসে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা দুর্নীতিমুক্ত ও নির্ভুলভাবে করে সরকার তাদের পাশে দাঁড়াবে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী হাওরের এই অবস্থায় প্রথম দিন থেকেই ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। তিনি আমাদের পাঠিয়েছেন, আমরা যেন প্রকৃত চিত্র প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে পারি।
ত্রাণমন্ত্রী আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, কৃষক বাঁচলে, দেশ বাঁচবে। এজন্য হাওরে আর ঠিকাদার পোষা, আর এদিক-ওদিক করার প্রকল্প হবে না। হাওরকে নিরাপদ উৎপাদনের ক্ষেত্র হিসেবে তৈরি করা হবে।
অনুষ্ঠানে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা যাতে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত থাকে, সেই লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকলকে কাজ করতে হবে। আগামী দিনগুলোতে যাতে এমন দুর্যোগ না হয়, সেই লক্ষ্যে কাজ করবে সরকার।
বিভাগীয় কমিশনার আপ্তাবুর রহমানের সভাপতিত্বে এবং সুনামগঞ্জের চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক সমর কুমার পালের সঞ্চালনায় এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়) রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন, সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল, সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল, বিএনপি নেতা আকবর আলী ও অ্যাডভোকেট শেরেনুর আলী বক্তব্য দেন।
পরে দুপুর সোয়া ২টার দিকে অতিথিরা উপজেলার খরচার হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের হাত সহায়তা তুলে দেন।
১ দিন আগে
সুনামগঞ্জের গ্রামবাসীর উদ্যোগে নদীর ওপর বাঁশের সেতু নির্মাণ
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে দীর্ঘদিন ধরে একটি সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসলেও তা পূরণ না হওয়ার কয়েকটি গ্রামের মানুষের সহযোগিতায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও এক ব্যবসায়ীর উদ্যোগে নদী পারাপারের জন্য বাঁশের সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এতে করে স্থানীয়দের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
বুধবার (৩০ এপ্রিল) উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের ভাঙারখাল নদীর ওপর বাদাঘাট বাজার (সবজি ও মাছ মহল) ও পৈলনপুর মাদরাসা অংশে টোল-ফ্রি বাঁশের সেতু দিয়ে চলাচলের জন্য তা উদ্বোধন করেন উত্তর বড়দল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুক ও সেতুটির জন্য বিনিয়োগদাতা ব্যবসায়ী মানিক মিয়া। এ সময় বিশিষ্ট সমাজসেবক আবুল হোসেনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য বক্তি ও এলাকাবাসী উপস্থিত ছিলেন।
সেতুটি নির্মাণ করায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
এলাকাবাসী বলছে, ভাঙারখাল নদী বাদাঘাট ও উত্তর বড়দল ইউনিয়নকে আলাদা করেছে। নদীটির ওপর বাদাঘাট বাজার (সবজি ও মাছ মহল) ও পৈলনপুর অংশে সেতু নির্মাণের দাবি জানালেও কেউ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। অথচ পৈলানপুর গ্রামসহ ৫-৬ টি গ্রামের বাসিন্দা, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, চাকুরীজীবী ও ব্যবসায়ীদের শুকনো মৌসুমে পায়ে হেঁটে আর বর্ষায় নৌকা দিয়ে পারাপার হতে হয়। অনেক সময় দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়েছে অনেককেই, শিক্ষার্থীদের বইখাতা পানিতে ডুবে যায়। পৈলানপুর গ্রামে মাদরাসা আছে; এখানেও শিক্ষার্থীরা আসা-যাওয়া করছে। তাই সহজে যাতায়াতের জন্য সেতুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এখানে সেতু নির্মাণের দাবি জানানোর পরও দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ আমলেই নেয়নি।
তারা বলেন, বাঁশের সেতুটি তৈরি করায় বর্ষায় ঝুঁকি নিয়ে ছোট নৌকায় করে নদী পারাপারের দীর্ঘদিনের বিড়ম্বনার অবসান ঘটেছে। গ্রামবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টা আর ইউপি চেয়ারম্যান মাসুক মিয়ার আন্তরিকতা ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মানিকের উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন এটি। সরকারিভাবে সেতু নির্মাণের দাবি জানানোর পরও কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সরকারিভাবে কোনো কিছু পাওয়ার আশা না করে নিজ নিজ অবস্থান থেকে উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসলে এবং সবাই সহযোগিতা করলে বড় কাজও সহজ হয়ে যায়। তাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে জনস্বার্থে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে স্থানীয় সচেতন মহল।
পৈলানপুর গ্রামেরে শিক্ষার্থীরা জানান, আমাদের কয়েকটি গ্রামে স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে এই নদী দিয়ে বর্ষায় ছোট্ট নৌকা দিয়ে পার হতে হয়। অনেক সময় নৌকা ডুবে বইখাতা পানি ভিজে যায়, আর শুকনো মৌসুমে নদীর মধ্যে বাঁধ সাকো দিয়ে পার হতে গিয়ে অনেকেই দুর্ভোগে পড়ি। বাঁশের সেতুটি হওয়ায় আমরা দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেলাম। এখানে যদি স্থায়ী একটি সেতু নির্মাণ করা হতো, তাহলে ভালো হতো।
সমাজসেবক আবুল হোসেন জানান, সেতুটি নির্মাণ হওয়ায় পৈলনপুর মাদরাসা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হাজারো ছাত্র-ছাত্রী এবং দুপাড়ের প্রায় পাঁচ হাজার সাধারণ জনগণের কোনো টাকা ছাড়াই নির্বিঘ্নে যাতায়াত করার সুযোগ সৃষ্টি হলো।
ব্যবসায়ী মানিক মিয়া বলেন, আমাদের যেহেতু টাকা নেই, তার জন্য জনগণের সুবিধার্থে বাঁশের সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন স্থানীয় চেয়ারম্যানসহ এলাকাবাসী। সবাই সহযোগিতা করায় সেতুটি দৃশ্যমান হয়েছে। এখন সবাই সহজে চলাচল করতে পারবে।
সেখানে স্থায়ী সেতু নির্মাণের জন্য সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।
চেয়ারম্যান মাসুক মিয়া জানান, বর্ষায় নৌকায় পারাপার করতে করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। এই বাঁশের সেতুটি তৈরি করে চালু করার জন্য যারা সহযোগিতা করছেন, তাদের জন্য শুভকামনা রইল। আমি জনগণের স্বার্থে সবসময় পাশে আছি; আগামী দিনগুলোতেও থাকব।
৩ দিন আগে
সুনামগঞ্জে বাঁধ ভেঙে ডুবছে ফসল, কাঁদছে কৃষক
গতকাল শুক্রবার ভোর থেকে সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার কাইল্যানীতে বাঁধের ওপর দিয়ে পানি উপচে পড়া শুরু হয়েছে। এর ফলে শালদিঘা হাওরের হাজারো কৃষক এখন চরম দুশ্চিন্তা ও ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
শুক্রবার (১ মে) ভোর থেকে উপচে পড়া পানির প্রবল চাপে ধীরে ধীরে বাঁধের কিছু অংশ ভেঙে যেতে শুরু করে, ফলে হাওরে পানি প্রবেশ করছে। উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও কৃষকরা বিকেল ৪টা পর্যন্ত বাঁধটি রক্ষায় কাজ করছিলেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাইল্যানী উপপ্রকল্পের ২০ নম্বর পিআইসির (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
শালদিঘা হাওরের কৃষক নিরঞ্জন সরকার বলেন, ‘হাওরের অর্ধেকের বেশি জমির ধান এখনও কাটা হয়নি। যদি বাঁধটি আটকানো না যায়, তাহলে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাব।’
একই এলাকার কৃষক রনি তালুকদার বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে ধান কাটতে পারছি না, কাটলেও শুকাতে পারছি না। এর মধ্যে আবার বাঁধ রক্ষার কাজ করতে হচ্ছে। আমরা এখন চরম বিপদে আছি।
উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, পাউবোর এসও ও পিআইসি সভাপতির যোগসাজশে বাঁধে দুর্নীতি হয়েছে। বাঁধের উচ্চতা কম হয়েছে, স্লোপ কম ছিল। এ কারণে হাওরের সর্বনাশ ঘটেছে।
তিনি বলেন, এই বাঁধের অন্য অংশের চেয়ে এই অংশ নিচু হয়েছে। এ কারণে সোমেশ্বরী নদীর পানি বাড়তেই এদিক দিয়ে পানি উপচে পড়ছে। একপর্যায়ে বাঁধটি ভেঙে গেছে।
মধ্যনগর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল বাশার বলেন, সকালে বাঁধের ভাঙনের খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে ৩০-৩৫ জন শ্রমিককে কাজে লাগিয়েছি। স্থানীয় কৃষকরাও চেষ্টা করছেন। পিআইসির সভাপতি লাল মিয়াকে কমপক্ষে ১০০টি ফোন দেওয়ার পরে রিসিভ করে বলেন, সাড়ে ৯টায় আসবেন। কিন্তু বিকেল ৪টা পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ নেই।
পিআইসির সভাপতি মো. লাল মিয়া চামরদানি ইউনিয়ন বিএনপির চার নম্বর ওয়ার্ডের সেক্রেটারি। তিনি জানান, টানা বৃষ্টির কারণে মাটি ক্ষয় হয়ে বাঁধটি নিচু হয়ে যায়। বাঁধ রক্ষার জন্য সারা রাত ঘটনাস্থলে ছিলাম। সকাল থেকে অন্য পাশে কাজ করতে হচ্ছে। এজন্য সেখানে যেতে পারিনি।
উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা কবির হোসেন জানান, শালদিঘা হাওরে প্রায় ৩০০ হেক্টর জমি রয়েছে। এর মধ্যে ৩০ হেক্টর জমির ধান পাকার আগেই জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত ১৬০ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সঞ্জয় ঘোষ বলেন, বাঁধ দিয়ে পানি প্রবেশের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে যাই। বাঁধ রক্ষায় ভোর থেকেই কাজ করছি। আশা করছি, বাঁধটি পুরোপুরি রক্ষা করা সম্ভব হবে।
৩ দিন আগে
সুনামগঞ্জে পানির নিচে ২০০ কোটি টাকার ধান, দিশেহারা হাওরের কৃষক
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে আকস্মিক জলাবদ্ধতা ও ভাঙা বাঁধের কারণে হাজার হাজার একর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ২০০ কোটি টাকার ধানের ক্ষতি হয়েছে। চরম দুর্দশায় পড়েছেন কৃষকরা, যাদের অনেকেই ঋণ নিয়ে আবাদ করেছিলেন। এখন ফসল হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।
দেখার হাওরের গুয়াছুড়া অংশে বুধবার দুপুরে কনকনে ঠান্ডা বাতাসের মধ্যেই কোমর সমান পানিতে ধান কাটছিলেন ১৫ জন কৃষি শ্রমিক। তাদের সকলেরই মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত পলিথিনে মোড়ানো। একটু দূরে দাঁড়ানো এক কৃষক (রইছ মিয়া, বাড়ি গুয়াছুড়া) কাটা ধানের মুঠি বাঁধার কাজ করছিলেন। তার চোখের কোনে টলটল করছিল পানি। সকল ধান কাটতে পেরেছেন কি না, জানতে চাইলেই চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছিল গলায় থাকা গামছা পর্যন্ত।
রইছ মিয়া বললেন, ‘দেখইন না হাওরের অবস্থা, সবইতো সাদা। ছয় কেয়ার (২৮ শতাংশে এক কেয়ার) পানিত ডুবছে, ধানের উপরে তিন চাইর হাত পানি। কীলাখান (কীভাবে) কাটমু! ছয় কেয়ার কাটছিলাম, শুকাইতাম পারছি না। ইখানো আরও ছয় কেয়ার আধাআধি (অর্ধেক দেবার) চুক্তিতে কাটরাম। ইগুন শুকানি যাইবো কিনা, জানি না। ১৯ কেয়ার জমিন করছি, সবই কিরাজ (এক ধরনের বর্গা)। প্রতি কেয়ার চাইর মণ দরে। মালিকরে সম্পূর্ণ ধান দেওন লাগব। মালিকে কম মানতো নায়। কম দিলে সামনের বছর আর জমিন দিতো নায়।’
তিনি জানালেন, দেড় লাখ টাকা ঋণ করে এনে এবার জমি করেছিলেন। দুশ্চিন্তা এখন তিন ধরনের— মালিকের ধান দেওয়া, জমি করা খরচের ঋণ মেটানো এবং সারা বছর খেয়ে বেঁচে থাকা।
দেখার হাওরের গুয়াছুড়া এলাকা থেকে ফেরার সময় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও বৃষ্টি ছিল না। বাতাসের মধ্যেই হাওরের কান্দায় (কিছু শুকনা জায়গা) গেরা উঠা (চারা গজানো) ধান চটের ওপরে ছড়িয়ে বাতাস লাগানোর চেষ্টা করছিলেন ষাটোর্ধ্ব জমিলা খাতুন ও আসমা বেগম।
ওখানেই কাঁচা, পচে যাওয়া ধানের মুঠি টেনে সরাচ্ছিলেন গুয়াছুড়ার কমর আলী (৭০)। কথা বলার চেষ্টা করতেই (কমর আলীর সঙ্গে) বললেন, ‘বারো আনা (৭৫ ভাগ) জমি ডুবি গেছে। পুরুত্তাইন (ছেলে-মেয়ে) লইয়া কিলা বাঁচতাম। চাইর মণ দরে জমিন আনছি। ৭০ হাজার টেকা (টাকা) খরচ কইরা ২০ কেয়ার জমিন করছি। মালিকরে ধান না দিলে তালাতালি কইরা আরেকজনে কইবো আমারে দেইন জমি, হে তো (কমর আলী) ধান দিতো পারে না, সময়মতো কাটতো পারছে না, আপনার (মালিকের) ক্ষতি অইলো (হলো), মালিক বুইজ্জা না বুইজ্জাঔ (বুঝে না বুঝে) জমিন অন্যজনরে দিতো পারে, এই বিপদ থাকি কেমনে বাঁচতাম ভাই।’
জলাবদ্ধতায় গুয়াছুড়ার এই দুই বর্গাচাষিকেই কেবল বিপন্ন করেনি। বরং জেলাজুড়ে বর্গাচাষিরা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
দেখার হাওরপাড়ের আস্তমা গ্রামের বড় বর্গাচাষি কে এম ফখরুল ইসলাম বললেন, দেখার হাওরে শতকরা ৭০ ভাগ কৃষক কিরাজ (বর্গাচাষ) করেন। একসময় বাগি করা হতো (আধাআধিতে), রংজমায়ও (আগে চুক্তি করে টাকা দিয়ে করা) করা হতো। এখন ফসল করতে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সকলেই কিরাজ করেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক বললেন, বাঁধ ভেঙেছে দুইটি। এগুলো হচ্ছে— মধ্যনগরের এরন বিল এবং একই উপজেলার জিনারিয়া বাঁধ। এই বাঁধগুলো বড় হাওরের না হলেও এসব বাঁধ ভেঙে তিনটি ছোট হাওরে পানি ঢুকেছে। জলাবদ্ধতায় পানিতে ডুবেছে ৯ হাজার ৪৯ হেক্টর জমি, সব মিলিয়ে পানিতে ডুবে বুধবার বিকেল পর্যন্ত সরকারি হিসেবে ৫০ হাজার টন ধানের ক্ষতি হয়েছে, টাকার অঙ্কে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকা।
তবে কৃষকদের দেওয়া তথ্যমতে, এই ক্ষতি আরও অনেক বেশি। পানি নামতে অন্তত এক সপ্তাহ লাগবে। উজানে বৃষ্টি হচ্ছে, সুনামগঞ্জেও আছে বৃষ্টি। সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ পয়েন্টে গত বুধবার বিকেলে ৪ দশমিক ৮৬ সেন্টিমিটার অর্থাৎ হাওরের বিপদসীমার দুই সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
জেলার শাল্লা উপজেলার সবকয়টি হাওর জলাবদ্ধতায় ডুবে যাওয়ায় কৃষকরা চাপটার হাওরের বাঁধ কেটে ধনু নদী দিয়ে মেঘনায় পানি নামানোর চেষ্টায় করেছিলেন। ওই হাওরপাড়ের কাদিরপুরের স্কুলশিক্ষক রমণ দাস বুধবার সন্ধ্যায় জানান, বাঁধ কেটে কোন লাভ হয়নি। পানি নামছে একেবারে ধীরগতিতে। চাপটার হাওরের পানি আর ধনু নদীর পানি প্রায় সমান সমান।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, বাঁধ কেটে জলাবদ্ধতার পানি ভাটিতে বা নদীতে ছাড়ার কোনো উপায় নেই। উজানে বৃষ্টি হওয়ায় নদীর পানিও বেড়েছে। এই অবস্থায় সুনামগঞ্জের নদীগুলোর পানি ধনু নদী হয়ে মেঘনায় নামতে সপ্তাহখানেক লাগবে। এরপর হাওরের জলাবদ্ধতার পানি নামতে থাকবে।
এদিকে, ম্যাথোলজি, প্রাই ম্যাথোলজি অ্যান্ড আর্থ সিস্টেম রিসার্চ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) অবসরপ্রাপ্ত আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী বলেছেন, সুনামগঞ্জে ৩০ এপ্রিল ১০০ থেকে ১২০ মিলিমিটার, ১ ও ২ মে ১২০ থেকে ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে। উজানে অর্থাৎ মেঘালয় চেরপুঞ্জিতেও একই ধরনের বৃষ্টিপাত থাকার পূর্বাভাস আছে।
সুনামগঞ্জে প্রতিবছর ফসল রক্ষার নামে শতকোটি টাকার বাঁধ হয়। নদী খনন না করে এসব বাঁধ দেওয়া নিয়ে স্থানীয় পরিবেশবিদ ও কৃষদের মধ্যে ক্ষোভ আছে। অপরিকল্পিত বাঁধে হাওরে জলাবদ্ধতা বাড়ছে বলেও দাবি করছেন স্থানীয়রা। এবারও হাওরে ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০৩ কিলোমিটার বাঁধ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার।
৫ দিন আগে
প্রকৃতি ও মানবসৃষ্ট অব্যবস্থাপনার দ্বিমুখী ছোবলে দিশেহারা সুনামগঞ্জের কৃষক
সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর জনপদ এখন পরিণত হয়েছে শোকের উপত্যকায়। একদিকে আকাশ থেকে নেমে আসা বজ্রের মরণঘাতী ছোবল, অন্যদিকে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর অতিবৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের সারা বছরের অন্ন জোগানোর সম্বল বোরো ধান।
প্রকৃতি ও মানবসৃষ্ট পরিস্থিতির নিষ্ঠুরতায় দিশেহারা হাওরবাসী এখন এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখে। বছরের পর বছর বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও তা রোধে সরকারি উদ্যোগগুলো যেন কেবলই লোক দেখানো।
সরকারি নথিতে বজ্রপাত প্রতিরোধে ২০১৮ সালে ১ লাখ এবং ২০২৪ সালে আরও দুই হাজার তালগাছ রোপণের তথ্য থাকলেও, বাস্তবে হাওরজুড়ে সেগুলোর কোনো চিহ্ন নেই। সঠিক পরিচর্যার অভাবে চারাগুলো বড় হয়ে ওঠার আগেই মরে গেছে।
কোটি টাকা ব্যয়ে বসানো বজ্রনিরোধক দণ্ডেরও একই দশা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৮টি বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হলেও তা হাওরবাসীর কোনো কাজে আসছে না।
গত পাঁচ বছরে জেলায় বজ্রাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৭২ জন। জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ পুনর্বাসন শাখার তথ্যমতে, চলতি বছরে এপ্রিল পর্যন্তই অকালে প্রাণ হারিয়েছেন ৯ জন। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বোরো মৌসুমে মাঠে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষক ও জেলেরা।
জেলা প্রশাসক মিনহাজুর রহমান জানান, তালগাছ রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে তদন্তের পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
তবে ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দোহাই দিয়ে আর কত লাশ পড়বে? তাদের দাবি, দ্রুত আধুনিক ও কার্যকর প্রযুক্তির ব্যবস্থা করাই এখন সময়ের দাবি। প্রকৃতির চরম বৈরিতার পাশাপাশি মানুষের তৈরি অব্যবস্থাপনা কৃষকের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।
এদিকে, গত সোম ও মঙ্গলবার রেকর্ড ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওরসহ বিভিন্ন স্থানে বুক সমান পানিতে তলিয়ে গেছে আধপাকা ধান। মাঠের অর্ধেক ধান এখনও অবিন্যস্ত। শ্রমিক সংকট ও বৈরী আবহাওয়ায় হারভেস্টার মেশিনও অকেজো হয়ে পড়ায় অসহায় কৃষক নিজের চোখের সামনেই দেখছেন স্বপ্নের মৃত্যু।
জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওরের কবিরপুর গ্রামের কৃষক জায়েদ মিয়া জানান, ১৫ কেদার জমি আবাদ করেছিলেন। মাত্র ৫ কেদার জমির ফসল তুলতে পেরেছেন। গত দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে সব জমি তলিয়ে গেছে। কৃষি শ্রমিক সংকট থাকায় অনেক চেষ্টা করেও ফসল ঘরে আনতে পারেননি তিনি।
জগন্নাথপুর সদর গ্রামের আবুল হোসেন জানান, পিংলার হাওরে ১০ কেদার জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। এখন পর্যন্ত মাত্র ২ কেদারের ধান কাটা হয়েছে। শ্রমিক সংকটের কারণে কাটা যাচ্ছে না। অন্যদিকে, হাওরে পানি ঢুকে ধান তলিয়ে যাচ্ছে। খুবই দুশ্চিন্তায় আছেন তারা।
৬ দিন আগে
সুনামগঞ্জের মধ্যনগরে সড়ক ভেঙে ডুবছে হাওর, দুশ্চিন্তায় কৃষক
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার এরনবিল (ইকরাছই) হাওরে পাহাড়ি ঢলের পানি প্রবেশ করেছে। নেত্রকোনার দুর্গাপুর হয়ে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তীব্র চাপে মনাই নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হামিদপুর গ্রামের পার্শ্ববর্তী একটি গ্রামীণ সড়ক ভেঙে এই পানি হাওরে প্রবেশ করছে। এতে এখনও হাওরে থাকা জমির ফসল ঘরে তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ইকরাছই হাওরে মোট ১১৪ হেক্টর ফসলি জমি রয়েছে। এর মধ্যে কৃষকরা এখন পর্যন্ত মাত্র ৪০ হেক্টর জমির ধান সফলভাবে ঘরে তুলেছেন। তবে পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট এই আকস্মিক ভাঙনে প্রায় ৫ থেকে ১০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। বর্তমানে হাওরের বাকি ধান রক্ষা করাই এখন স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষকদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাওর এলাকার কৃষকরা জানান, পাহাড়ি ঢল আসার সময়টি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। গত কয়েকদিন ধরে উজানের ঢলে নদীর পানি বাড়ায় তারা আগে থেকেই সতর্ক ছিলেন। সড়ক ভেঙে পানি ঢোকায় এখন অবশিষ্ট পাকা ধান দ্রুত কেটে ঘরে তুলতে তারা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসী যৌথভাবে ভাঙন মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন যাতে পরিস্থিতির আরও অবনতি না ঘটে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতির সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপজেলা প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।
মধ্যনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সঞ্জয় ঘোষ জানান, যে সড়কটি ভেঙে হাওরে পানি প্রবেশ করছে, সেটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো বাঁধ নয়, এটি একটি গ্রামীণ সড়ক। নেত্রকোনার দুর্গাপুর এলাকা দিয়ে নেমে আসা প্রবল পাহাড়ি ঢলের কারণে মনাই নদীর পানির চাপ সহ্য করতে না পেরে সড়কটির একটি অংশ ভেঙে গেছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। যদিও অধিকাংশ জমির ফসল ইতোমধ্যে কাটা শেষ হয়েছে, তবুও অবশিষ্ট ফসল রক্ষার জন্য স্থানীয় জনতা ও প্রশাসন মিলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
৮ দিন আগে
সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে দুই কৃষক নিহত, হাওরে ধান কাটার সময় সতর্কতা জারি
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় বজ্রপাতে পৃথক ঘটনায় দুই কৃষক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় শান্তিগঞ্জ উপজেলায় আরও তিনজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) দুপুরে জেলার বিভিন্ন হাওরে ধান কাটার সময় এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়েন তারা।
নিহতরা হলেন— সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের আব্দুল্লাহপুর গ্রামের আব্দুর কাদিরের ছেলে জমির উদ্দিন (৪০) এবং একই উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের বৈটাখালি গ্রামের কায়িদ হোসেনের ছেলে জমির হোসেন (৪২)।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, আজ (সোমবার) দুপুরে আকাশ যখন মেঘাচ্ছন্ন হয়ে আসে, জমির উদ্দিন তখন অন্যান্য কৃষকদের সঙ্গে আব্দুল্লাহপুর গ্রামের দেখার হাওরে ধান কাটছিলেন। এ সময় আকস্মিক বজ্রপাতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে, প্রায় একই সময়ে গৌরারং ইউনিয়নের বৈটাখালি গ্রামের বাসিন্দা জমির হোসেন বাড়ি থেকে বের হয়ে গ্রামের নদীঘাটে দোকান খুলতে যাওয়ার পথে বজ্রপাতের কবলে পড়েন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকেও উদ্ধার করে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকেও মৃত ঘোষণা করেন।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শফিকুর রহমান দুইজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এ ছাড়াও, সুনামগঞ্জের পার্শ্ববর্তী শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে আরও তিনজন কৃষক আহত হয়েছেন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছেন।
হাওরাঞ্চলে ধান কাটার ভরা মৌসুমে বজ্রপাতে প্রাণহানির এমন ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সেই সঙ্গে পুরো এলাকাজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও প্রশাসন হাওরে কর্মরত কৃষকদের দুর্যোগের পূর্বাভাস মেনে সতর্ক থেকে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে। দুর্যোগের সময় খোলা জায়গা বা হাওর থেকে দ্রুত নিরাপদ পাকা স্থাপনায় আশ্রয় নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
৮ দিন আগে
বন্যার ঝুঁকিতে সুনামগঞ্জের হাওরজুড়ে দ্রুত ধান কাটার তাড়া
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরজুড়ে ২৮ এপ্রিল থেকে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। টানা বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলের পূর্বাভাসে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সম্ভাব্য ক্ষতি এড়াতে দ্রুত পাকা বোরো ধান কেটে ঘরে তোলার তাগিদ দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদারের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর আগামী ৭ দিনের (২৩ এপ্রিল হতে ৩০ এপ্রিল) বৃষ্টিপাতের তথ্য অনুযায়ী, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকা ও তৎসংলগ্ন উজানে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। সেক্ষেত্রে ২৪-২৬ এপ্রিল হালকা থেকে মাঝারি, ২৭ এপ্রিল মাঝারি হতে ভারী এবং ২৮ থেকে ৩০ এপ্রিল ভারী হতে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে।
উক্ত বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস অনুযায়ী, হাওর অববাহিকার প্রধান নদীগুলো (সুরমা-কুশিয়ারা, ধনু-বৌলাই ও ভুগাই-কংস) এবং অন্যান্য উপ-নদীগুলোর পানি সমতল বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে এবং ২৮ এপ্রিল থেকে নদীগুলোর কোথাও কোথাও বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে।
পাউবোর বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বর্তমানে সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি সমতল বিপদসীমার ১ দশমিক ৭৬ মিটার বা ৫ দশমিক ৭৭ ফুট নিচে রয়েছে। ফলে ২৮ এপ্রিল থেকে সুনামগঞ্জ জেলায় আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির ঝুঁকি রয়েছে। আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সুনামগঞ্জের হাওরের বোরো ফসল ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। ফলে কৃষকদের যেসব জমির ৮০ শতাংশ ধান পাকা সেসব জমির ধান দ্রুত কাটার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন হাওরে আগাম জাতের ধান কাটা শুরু হয়েছে। কৃষকরা কঠোর পরিশ্রম করে ধান কেটে বাড়িতে এনে মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা, শ্রমিক সংকট, ধানের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির বিষয়গুলো তাদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি বছরই সময়মতো বাঁধ নির্মাণ শেষ না হওয়া ও অনিয়মের কারণে ঝুঁকি থেকে যায়। ‘হাওর বাঁচাও’ আন্দোলনের নেতারাও একই অভিযোগ তুলে বলেছেন, বিপুল অর্থ ব্যয়ে বাঁধ নির্মাণ হলেও কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে না। জেলার ১২টি উপজেলায় চলতি মৌসুমে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া থাকলে প্রায় ১৪ লাখ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে পাউবো জানিয়েছে, চলতি বছর ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পের মাধ্যমে ৬০৩ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।
কৃষকরা জানান, ধান ভালো হলেও এখন সবচেয়ে বড় শঙ্কা বাঁধের স্থায়িত্ব।
আঙ্গারুলি হাওরের কৃষক জমির মিয়া বলেন, ‘ফসল ভালো, কিন্তু বাঁধ নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না।’
খরচার হাওরের কৃষক লতিফ মিয়া বলেন, ‘ধান কাটছি, তবে পাহাড়ি ঢলে বাঁধ না ভাঙলেই বাঁচি।’
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, এবার জেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি আবাদ হয়েছে। আশা করছি, কৃষকরা তাদের কষ্টে ফলানো ফসল কেটে গোলায় তুলতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি, ধান ৮০ শতাংশ পেকে গেলে তারা যেন দ্রুত কেটে ফেলেন। আমরা সার্বক্ষণিক তাদের পরামর্শ দিচ্ছি।
১১ দিন আগে
ডিজেল সংকটে বেড়েছে হারভেস্টারের ভাড়া, বিপাকে হাওরাঞ্চলের কৃষক
সিলেট বিভাগের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরু হলেও ডিজেল সংকট ও নতুন করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতে। সময়মতো ধান কাটতে না পারার আশঙ্কার পাশাপাশি বাড়তি খরচের চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা।
দ্রুত ফসল ঘরে তুলতে কম্বাইন হারভেস্টারের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও ভাড়ার হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
কৃষকদের দাবি, এক বছর আগেও প্রতি একর জমির ধান কাটতে যেখানে সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা খরচ হতো, বর্তমানে তা বেড়ে সাড়ে ৭ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। কোথাও কোথাও এর চেয়েও বেশি ভাড়া দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেলেও ধানের বাজারমূল্য সে অনুপাতে না বাড়ায় কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের চার জেলায় বর্তমানে ১ হাজার ৪৭৩টি কম্বাইন হারভেস্টার সক্রিয় রয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় এ সংখ্যা এখনও অপর্যাপ্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের কৃষক সেলিম রেজা চৌধুরী বলেন, এবার ধান ভালো হয়েছে, কিন্তু কাটার সময় এসে আমরা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছি। এক একর জমি কাটতে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে চাইলেও অনেক সময় হারভেস্টার পাওয়া যাচ্ছে না। দিন যত যাচ্ছে, খরচ তত বাড়ছে। বৃষ্টি হলে বা আগাম বন্যা এলে ফসল নষ্ট হওয়ার ভয় তো আছেই।
তিনি বলেন, ধানের দাম এখনও তেমন বাড়েনি। একদিকে সার, বীজ, সেচ—সবকিছুর খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে কাটাই ও মাড়াইয়ের খরচও দ্বিগুণ। সব মিলিয়ে হিসাব করলে লোকসান ছাড়া কিছুই থাকছে না।
অনেক কৃষক ঋণ করে চাষ করেছেন, এখন সেই ঋণ পরিশোধ নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বলে জানান তিনি।
একই উপজেলার আরেক কৃষক আবদুল করিম বলেন, আমরা বাধ্য হয়ে অপেক্ষা করছি, কখন হারভেস্টার পাওয়া যাবে। অনেকেই আবার দলবেঁধে মেশিন বুকিং দিচ্ছেন, কিন্তু সংকট এত বেশি যে সময়মতো ধান কাটা যাচ্ছে না। এতে জমিতে পাকা ধান পড়ে থাকার ঝুঁকি বাড়ছে।
তাহিরপুর উপজেলার বালিজুড়ি এলাকার হারভেস্টার মালিক মঈনুল ইসলাম বলেন, আমাদেরও পরিস্থিতি ভালো নয়। ডিজেল ছাড়া মেশিন চালানো সম্ভব নয়, কিন্তু ডিলারদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে ছাড়পত্র নিয়েও পর্যাপ্ত জ্বালানি মিলছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে বেশি দামে ডিজেল কিনতে হচ্ছে। আগে যেখানে নির্দিষ্ট দামে ডিজেল পাওয়া যেত, এখন সেখানে অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে। যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ খরচও বেড়েছে। সব মিলিয়ে ভাড়া না বাড়িয়ে আমাদের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব না।
হারভেস্টারচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দিনরাত কাজ করেও চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। অনেক জায়গা থেকে ফোন আসে, কিন্তু সময় মেলানো যায় না। ডিজেল সংকট থাকায় একটানা কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, জেলায় প্রকৃতপক্ষে কোনো জ্বালানি সংকট নেই, তবে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার কারণে বিতরণে কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
১৩ দিন আগে
সুনামগঞ্জে আগাম বন্যার আশঙ্কা, দ্রুত ধান কাটার আহ্বান পাউবোর
উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় সুনামগঞ্জের সুরমা, কুশিয়ারা, বাউলাই নদীসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে আগাম বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এমন পরিস্থিতিতে জমির ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেলে দ্রুত তা কাটার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানান পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জ শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার।
বিজ্ঞপ্তিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত সুরমা, কুশিয়ারা ও বাউলাইসহ অন্যান্য নদীর উজান অববাহিকায় বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী কয়েকদিন নদ-নদীর পানি সমতলে দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, এমনকি যেকোনো সময় আগাম বন্যা পরিস্থিতি উদ্ভব হতে পারে। এছাড়া হাওরের অভ্যন্তরে বৃষ্টিপাতের ফলে অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে।
সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে হাওরের বোরো ফসলের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কৃষকগণকে যেসব জমির ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেছে, সেসব জমির ধান দ্রুত কাটার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জ শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী।
১৪ দিন আগে