জাতীয় সংসদে বিরোধী দল হিসেবে জনগণের কষ্টের কথা তুলে ধরেও সংকট সমাধানে কিছু করতে না পেরে রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, ‘আমরা যখন তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকটের কথা বলি, সরকার তখন স্বৈরাচার ফিরে আসবে বলে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখায়। অথচ দেশের মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। আমরা সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এই সংকট সমাধানে টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের নিয়ে গঠিত একটি টিম দিয়ে সহযোগিতা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সরকার আমাদের প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। সংসদের ভেতরে বারবার বলেও কিছু করতে না পেরে আমরা বাধ্য হয়ে রাজপথে নেমেছি।’
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে বগুড়া সার্কিট হাউজ মিলনায়তনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
শফিকুর রহমান বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ৫৫ বছর অতিক্রম করেছে। একটি জাতির জন্য এ সময় নেহাত কম নয়। কিন্তু মালয়েশিয়া ও জাপানের মতো দেশগুলো অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশ সেই জায়গায় যেতে পারেনি।
তিনি বলেন, পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানিরা শোষণ ও ব্যবসা করলেও স্বাধীনতার পর তাদের মালিকানাধীন সম্পদ রাষ্ট্রের মালিকানায় চলে আসে। আদমজী জুট মিলকে একসময় বিশ্বের বৃহত্তম পাটশিল্প প্রতিষ্ঠান বলা হতো। কিন্তু এখন আদমজীর নাম-নিশানা মুছে গেছে। স্বাধীনতার পর অনেক কিছু লুটপাট হয়েছে। বর্তমানে সেখানে শিল্পপার্ক করা হলেও আদমজীর আগের গৌরব ফিরে আসেনি।
‘আমি এজন্য পাকিস্তানি বেনিয়া ব্যবসায়ীদের পক্ষ নিচ্ছি না। আমি আমাদের মানসিকতা এবং বাস্তবতার উদাহরণ দিচ্ছি,’ বলেন তিনি।
জামায়াত আমির বলেন, দেশে কিছু শিল্প স্থাপনা গড়ে উঠলেও তা যথেষ্ট নয়। শিল্পের মূল শক্তি হচ্ছে বিদ্যুৎ। তেল, গ্যাস ও সৌরশক্তিসহ বিভিন্ন উৎস থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। বর্তমানে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে দেশ মারাত্মক সংকটে পড়েছে এবং শিল্প খাতেও এর প্রভাব পড়েছে।
তিনি বলেন, সম্প্রতি তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর নেতারা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে জানিয়েছেন, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ায় তাদের উৎপাদন ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এতে তারা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে খেলাপি হতে পারেন, শ্রমিক ছাঁটাই করতে পারেন। একই সঙ্গে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতারা অন্য দেশে চলে যাচ্ছেন।
‘আমাদের বৃহত্তম রপ্তানি খাতের এই অবস্থা হলে বাকিগুলো এখান থেকেই বুঝা যায়,’ বলেন তিনি।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমরা সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এই সংকট সমাধানে টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের নিয়ে গঠিত একটি টিম দিয়ে সহযোগিতা করতে চেয়েছিলাম। তারা সরকারের এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মিলে সংকট সমাধানের পথ তৈরি করবেন। আমরা দেশকে ভালোবাসি, এজন্য এই অফার দিয়েছি।’
তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের সংসদের ইতিহাসে বিরোধী দল কখনো সরকারি দলকে এ ধরনের সহযোগিতার প্রস্তাব দেয়নি।
শফিকুর রহমানের দাবি, এর আগে তেলের সংকট দেখা দিলে তিনি পাম্পে পাম্পে ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সংসদে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। কিন্তু সরকার সংকট অস্বীকার করেছে। বিদ্যুৎ সংকটের ক্ষেত্রেও একই অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সংসদের ভেতরে যখন আমরা দেখলাম কিছু করতে পারছি না, তখন এই দাবির সঙ্গে আরও পাঁচটি দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছি। আন্দোলনের দ্বিতীয় ধাপে এখন লং মার্চ করছি।’
লং মার্চ নিয়ে সমালোচনার জবাবে জামায়াত আমির বলেন, তেল সংকটের মধ্যে এত গাড়ি নিয়ে লং মার্চ করার প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। কিন্তু তারা লং মার্চ না করলেও এসব গাড়ি বসে থাকত না, চলাচল করত। বরং লং মার্চের মাধ্যমে তারা জনগণের দাবি আদায়ের আন্দোলন করছেন।
‘এভাবেই একদিন জনগণের দাবি পূরণ হবে। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে,’ বলেন তিনি।
‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে’
চব্বিশের বিপ্লবের পর জনগণ দেশের আমূল সংস্কার চেয়েছিলেন উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, সেই সংস্কারের লক্ষ্যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল জামায়াত। জনগণ সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ৬৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোট ‘হ্যাঁ’র পক্ষে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘কিন্তু সরকার ক্ষমতা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দেওয়া ওয়াদার বরখেলাপ করেছে। তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘জনগণের ভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করার শক্তি আমাদের কারও নেই। জনগণ চায় তাদের রায়ের বাস্তবায়ন। আমরা সেই দাবিগুলো নিয়েই আন্দোলন করছি।’
১৯৭০ সালের নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে শফিকুর রহমান বলেন, সেই নির্বাচনের রায় অমান্য করার কারণেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ এবং সংসদ অধিবেশন ডাকার ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান সরকার তাতে রাজি না হওয়ায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।
জনগণের অধিকারের পাহারাদারি করাই বিরোধী দলের কাজ
বিরোধী দলের ভূমিকা সম্পর্কে জামায়াত আমির বলেন, ‘বিরোধী দল হিসেবে আমাদের কাজ হলো জনগণের অধিকারের পাহারাদারি, চৌকিদারি করা, ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করা। বিরোধী দলের হাতে কখনো স্বৈরশাসন কায়েম হয় না।’
তিনি বলেন, তারা সাড়ে ১৫ বছর স্বৈরশাসকের কবলে ছিলেন। এ সময়ে তাদের অনেক নেতাকে হারাতে হয়েছে। অনেকে গুম হয়ে এখনো ফিরে আসেননি। স্বজনরা জানেন না তাদের প্রিয়জনরা বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন।
সাংবাদিকদের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা সবসময় আপনাদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাই। কিন্তু মাঝে মাঝে উল্টাপাল্টা দু-একজন করেন। আমাদের বক্তব্য কাঁটছাঁট করে প্রচার করা হয়। তারপরেও আমরা মিডিয়ার ব্যাপারে শ্রদ্ধাশীল। কখনো মিডিয়াকে আঘাত করে কথা বলি না।’
তিনি বলেন, ‘এটা হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে পাওয়ারফুল পিলার। এটা সততার উপরে থাকলে রাষ্ট্রের অবশিষ্ট তিনটি স্তম্ভ সোজা পথে চলতে বাধ্য।’
একটি সুন্দর দেশ গঠনে সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করেন তিনি।
বগুড়ার উন্নয়ন প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, ‘যেখানেই অসংগতি দেখব সেখানেই কথা বলব। তাই বলে বগুড়ার জন্য আমাকে কথা বলতে হবে, এটা ভাবিনি। বগুড়া সবসময় অবহেলিত, বঞ্চিত। বগুড়া তার পাওনা বুঝে পাক, এটা আমি চাই।’
মতবিনিময়কালে বগুড়া মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেল, ইফসুর মহাসচিব ড. মোস্তফা ফয়সাল পারভেজসহ স্থানীয় জামায়াত নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কর্মরত সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
মতবিনিময় শেষে শফিকুর রহমান হোটেল মমইন কনভেনশন সেন্টারে বগুড়া জেলা ও মহানগর জামায়াতের রুকন সম্মেলনে যোগ দেন।
এর আগে শুক্রবার রাতে বগুড়ায় এসে সার্কিট হাউজে রাতযাপন করেন তিনি। তারপর আজ শনিবার সকালে বগুড়ার ধুনট উপজেলার মানিকপোটল (মরিচতলা) গ্রামে বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের প্রথম শহিদ আব্দুল মালেকের কবর জিয়ারত করেন শফিকুর রহমান।
এ সময় তিনি কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ফাতিহা পাঠ করেন এবং শহিদ আব্দুল মালেকের শাহাদাত কবুলের জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। পরে স্থানীয় মাদরাসায় শহিদ আব্দুল মালেকের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
আমিরের আগমন উপলক্ষে স্থানীয় মাদরাসা মাঠে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হন। সেখানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে শফিকুর রহমান বলেন, ‘দেশের মানুষ ভালো নেই, দেশ ভালো নেই। বিদ্যুৎ এবং সার সংকট চরমে। দেশের মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। আমরা জনগণের কষ্টের কথা জাতীয় সংসদে বলার চেষ্টা করছি, সরকার আমাদের কথা বলতে দিচ্ছে না। বাধ্য হয়ে জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য আমরা রাজপথে নেমেছি।’
এ সময় জামায়াতের নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম এমপি, নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন, জেলা নায়েবে আমির অধ্যাপক আব্দুল বাছেদ, ধুনট উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আমিনুল ইসলামসহ স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।