ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে মধুখালীর ছাত্রলীগ কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তর (২৭) মৃত্যর ঘটনায় ডিবির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)-সহ অভিযানে অংশ নেওয়া সব পুলিশের সদস্যদের নামে বিভাগীয় মামলা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ঘটনায় গঠিত জেলা পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যের আলোকে এই সুপারিশ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) ফরিদপুরের পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী এ তথ্য জানান। ইতোমধ্যে প্রতিবেদনসহ সুপারিশপত্র পুলিশের সদর দপ্তরে পাঠিয়ে দিয়েছেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন তিনি।
পুলিশ সুপার বলেন, আভ্যন্তরীণ তদন্তে ওসিসহ ডিবি পুলিশের ১১জন সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
গত ২০ জুন বিকেলে মধুখালী পৌরসভার পশ্চিম গোন্ধারদিয়া এলাকায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে অবস্থিত নিজ বাড়ির সামনে থেকে ইশতিয়াককে আটক করে ডিবি পুলিশ। পরদিন (২১ জুন) সকালে ডিবি হেফাজতে অসুস্থ হয়ে পড়লে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যু হয় ওই যুবকের।
মৃত মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ পশ্চিম গোন্দারদিয়া মহল্লার বাসিন্দা মৃত এসকেন হায়দারের ছেলে। দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড় ছিলেন। ইশতিয়াক ফরিদপুর আইন কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ফরিদপুর চিনি কলের মৌসুমী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।
ওই অভিযানে অংশ নেওয়া ডিবির উপপরিদর্শক (এসআই) আহাদুজ্জামান ২১ জুন সকাল সোয়া ৬টার দিকে বাদী হয়ে ইশতিয়াককে আসামি করে মধুখালী থানায় একশ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারের দাবি করে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা করেন।
মামলার বিবরণে বলা হয়, গত ২০ জুন দিবাগত রাত ২টার দিকে পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে (ইশতিয়াকের বাড়ির সামনে) যান। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ইশতিয়াক পালানোর চেষ্টা করেন। পরে তাকে আটক করে দুইজন সাক্ষীর সামনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ইশতিয়াক তার কাছে গাঁজা আছে বলে স্বীকার করেন এবং নিজ হাতে প্যান্টের ডান পকেট থেকে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় গাঁজা বের করে দেন।
তবে ওই ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজ থেকে দেখা যায়, ঘটনাটি রাতে নয় দিনে ঘটেছে। ওই সময় ইশতিয়াক প্যান্ট নয়, লুঙ্গি পরিহিত ছিলেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, ইশতিয়াকের মাথায় আঘাত করে শরীর তল্লাশি করেন এক ডিবি সদস্য। একপর্যায়ে তল্লাশির স্থান থেকে কয়েক হাত দূরে বাঁ দিকে ‘এই যে এক টোপলা’, ‘এই যে’ বলে চিৎকার করে ওঠেন ওই ডিবি সদস্য।
এরপর ইশতিয়াকের কাছ থেকে মাদক উদ্ধারের দাবিতে পুলিশ মামলা করে। ওই মামলায় স্থানীয় মো. আলমগীর হোসেন ও বিনয় সাহাকে সাক্ষী মেনে বলা হয়, তাদের সামনে ডিবি পুলিশের কাছে ইশতিয়াক প্যান্টের পকেট থেকে গাঁজা বের করে দেন।
তবে ওই দুই সাক্ষীই পরবর্তীতে তদন্ত কমিটির সদস্যদের জানিয়েছে, ঘটনার সময় তারা কেউই ঘটনাস্থলে ছিলেন না। বরং ঘটনাস্থল থেকে অন্তত একশ মিটার দূরে মধুখালী বাজার এলাকায় তারা ছিলেন। পরে তাদের সঙ্গে মিথ্যাচার করে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে সই নেওয়া হয় বলে ওই দুই সাক্ষী অভিযোগ করেন।
ইশতিয়াকের মা খাদিজা আক্তার ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, ২০ জুন দিবাগত রাতে ৬৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ইশতিয়াককে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তার আত্মীয় সোহেল মুন্সীর সঙ্গে ডিবি পুলিশের কথা হয়। পরে ডিবি জানায়, ‘এ ছেলে কলেজে পড়ে, ছাত্রলীগ করে। আজ তাকে ছাড়া হবে না, কাল সকালে এক লাখ টাকা নিয়ে ফরিদপুর আসেন।’
খাদিজা আক্তার আরও বলেন, সকালে তিনি এক লাখ টাকা নিয়ে ফরিদপুরে যান, কিন্তু জীবিত ছেলের বদলে তিনি ছেলের মরদেহ পান।
তদন্ত কমিটির কাছেও খাদিজা আক্তার এই একই বক্তব্য দেন।
ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটিতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ফাতেমা ইসলামকে প্রধান সদস্য করা হয়। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন—অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. শামসুল আজম এবং জেলা স্পেশাল ব্রাঞ্চের ওসি মোশাররফ হোসেন।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দেখে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ ইতোমধ্যে প্রতিবেদনটি পুলিশের সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী আরও বলেন, ওই দিন ওসির নির্দেশে ডিবি পুলিশের যেসব সদস্য অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন, তারা সকলেই কোনোভাবে এই অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত। এ ঘটনায় সবারই কমবেশি ভূমিকা রয়েছে।
তবে পুলিশ সুপার আলাদাভাবে মাদক উদ্ধার, প্যান্ট ও লুঙ্গি পরা, দিনে না রাতে অভিযান, পুলিশের মামলায় মানিত দুই সাক্ষীর ঘটনাস্থলে না থাকা, ইশতিয়াকের মুক্তির জন্য পরিবারের কাছে টাকা দাবি করাসহ বিভিন্ন অসঙ্গতির বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী বলেন, মামলা দায়ের করে বিভাগীয় তদন্ত করার পর ডিবি ওসিসহ অভিযানে অংশ নেওয়া সব সদস্যদের মধ্যে এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কার কতটুকু ভূমিকা ছিল, সে আলোকে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ওই সময় ফরিদপুরে ডিবি পুলিশের ওসি ছিলেন মো. আলমগীর হোসেন। অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যরা হলেন—উপপরিদর্শক মো. আহাদুজ্জামান ও মোতাহার আলী, সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর মো. হাজিকুল ইসলাম, কনস্টেবল আবু সুফিয়ান, রাকিব মোল্লা, মনিরুজ্জামান, মো. রাকিবুল ইসলাম, ফরহাদ হোসেন মিয়া ও চম্পা হালদার। গাড়ি চালক ছিলন মো. সবুজ মোল্লা।
এ ঘটনার পর ফরিদপুরের ওসিসহ ডিবি পুলিশের ১১ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে প্রত্যাহার করে ফরিদপুর পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়।