ভিমরুলি
প্রশাসনের নির্দেশনা উপেক্ষায় ঝালকাঠির ভিমরুলি পেয়ারাবাগানে বিশৃঙ্খলা, বাড়ছে দুর্ঘটনা
ঝালকাঠির সদর উপজেলার কীর্তিপাশা-ভিমরুলিসহ বিভিন্ন পেয়ারাবাগান এলাকায় পর্যটকদের চলাচল ও নৌভ্রমণে উচ্চশব্দে গান বাজানো, অশালীন আচরণ এবং বেপরোয়া ট্রলার চলাচল নিয়ন্ত্রণে একাধিকবার নির্দেশনা ও সতর্কতা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন। তবে প্রশাসনের এসব নির্দেশনা কার্যত উপেক্ষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাদের দাবি, বারবার আহ্বান ও বিধিনিষেধ জারি করা হলেও এক শ্রেণির ভ্রমণপিপাসু নির্ধারিত নিয়ম মানছেন না। ফলে এলাকার পরিবেশ, জনশৃঙ্খলা, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয়দের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুতগতির ট্রলারের সৃষ্ট ঢেউয়ে পেয়ারাবোঝাই ডিঙি নৌকা ডুবে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া পর্যটকদের বেপরোয়া আচরণের কারণে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
প্রতি শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে ঝালকাঠি সদর উপজেলার ভিমরুলি ভাসমান হাটে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার নিয়ে পর্যটকদের আগমন শুরু হয়। এ সময় অনেক ট্রলারে সাউন্ড বক্সে উচ্চশব্দে গান বাজানো হয় যা পুরো পরিবেশকে ভারী করে তোলে। দ্রুতগতির ট্রলারের ঢেউয়ে এরই মধ্যে পেয়ারাবোঝাই কয়েকটি ডিঙি নৌকা ডুবে যাওয়ার মতো দুর্ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।
গত ১৭ জুলাই ভ্রমণে গিয়ে একটি আমগাছ থেকে খালে লাফ দিয়ে নিখোঁজ হয় সানি (১৩) নামে এক কিশোর। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো এবং পরিবেশ, প্রকৃতি, জনশৃঙ্খলা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সম্প্রতি একটি নির্দেশনামূলক নোটিশ জারি করেছে ঝালকাঠি সদর উপজেলা প্রশাসন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেগুফতা মেহনাজ স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্তিপাশা ইউনিয়নের ভিমরুলি পেয়ারাবাগান ও ভাসমান পেয়ারার বাজার দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত একটি স্থান। এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বাগানের স্বাভাবিক পরিবেশের পরিবেশগত ভারসাম্য (ইকোলজিক্যাল ব্যালেন্স) এবং স্থানীয় জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখতে কয়েকটি নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
নোটিশে বলা হয়েছে, পেয়ারাবাগান ভ্রমণের সময় ডিজে সিস্টেম, লাউডস্পিকার বা উচ্চমাত্রার শব্দের কোনো সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করা যাবে না, কারণ তা স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থলের জন্য হুমকিস্বরূপ।
এছাড়া ইঞ্জিনচালিত বড় ট্রলার নিয়ে ভাসমান পেয়ারার বাজার বা বাগানে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রশাসনের মতে, বড় ট্রলার বাগানের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করে এবং জলজ ও স্থলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
পর্যটকদের ছোট ও মাঝারি আকারের ইঞ্জিনবিহীন নৌযান ব্যবহারের অনুরোধ জানানো হয়েছে, যাতে বাগানের স্বাভাবিক পরিবেশ ও পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় থাকে।
নোটিশে আরও বলা হয়েছে, পর্যটকদের সঙ্গে আনা খাবারের উচ্ছিষ্ট, পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতলসহ কোনো ধরনের বর্জ্য পানিতে ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রতিটি নৌযানে অন্তত একটি করে ডাস্টবিন রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিটি ট্রলার বা নৌযানে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট ও লাইফ বয়া রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে নৌযানের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কারণ অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌযান যেকোনো সময় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
নোটিশে অনুমতি ছাড়া পেয়ারাবাগানে প্রবেশ, পেয়ারা বা আমড়া সংগ্রহ এবং গাছের ডালপালা ভাঙা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি পর্যটকদের সুশৃঙ্খল আচরণ, শালীনতা বজায় রাখা, ইভটিজিং থেকে বিরত থাকা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নোটিশে আরও বলা হয়েছে, ‘আসুন সবাই মিলে ভাসমান পেয়ারা বাজার ও পেয়ারা বাগানের পরিবেশ সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও পর্যটকবান্ধব রাখি। এ বাগান আমাদের সম্পদ। এ সম্পদ রক্ষায় আসুন সবাই সচেতন হই। পর্যটন এলাকার সুন্দর ও নান্দনিক পরিবেশ বজায় রাখা, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য সবার সচেতনতা ও সহযোগিতা একান্ত কাম্য।’
তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রশাসনের নির্দেশনা সত্ত্বেও অনেক পর্যটক বিধিনিষেধ না মেনেই ভ্রমণ করছেন। অনেক নৌযানে উচ্চ শব্দে গান বাজানো এবং অশোভন আচরণের কারণে এলাকায় শব্দদূষণ বাড়ছে। পাশাপাশি প্লাস্টিকের প্যাকেট, পানির বোতল, খাবারের মোড়কসহ বিভিন্ন বর্জ্য খাল, নদী ও আশপাশের জলাশয়ে ফেলে পরিবেশ দূষণ করা হচ্ছে।
তাদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে পেয়ারাবাগানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া অতিরিক্ত ভিড়, অনিয়ন্ত্রিত নৌচলাচল এবং প্রশাসনের নির্দেশনা অমান্যের কারণে পর্যটন এলাকার নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, শুধু সতর্কীকরণ নয়, নিয়ম অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, জরিমানা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাদের মতে, কার্যকর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে প্রশাসনের নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে পর্যটন এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, পরিবেশ রক্ষা এবং দর্শনার্থীদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে ইউএনও সেগুফতা মেহনাজ বলেন, ‘পরিবেশ ও শৃঙ্খলা রক্ষায় নোটিশ জারি করা হয়েছে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ভিমরুলির পর্যটন আকর্ষণ, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
৫ দিন আগে
ভিমরুলি ভাসমান পেয়ারা বাজার: বাংলার ভেনিস বরিশালের সৌন্দর্য্যে সেরা সংযোজন
থাইল্যান্ডের ড্যামনোয়েন সাদুয়াক বাজার অথবা ইতালির ভেনিসের রিও সান বার্নাবা বাজার নয়। ভাসমান পেয়ারা বাজার বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে বাংলার ভেনিস বরিশালের ভাসমান হাটকে।
বিগত কয়েক বছর ধরে দর্শনীয় স্থানটি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠে যাওয়ায় দেশীয় পর্যটকদের ভাসমান বাজারের অভিজ্ঞতা নিতে আর বিদেশমুখী হতে হচ্ছে না। উল্টো বাইরে থেকে বিদেশি পরিব্রাজকরা হাতে ডিএসএলআর নিয়ে ভিড় জমাচ্ছেন বাংলাদেশের দক্ষিণের এই ভাসমান কাঁচাবাজারে। চলুন, ঐতিহাসিক বরিশালের সৌন্দর্য্যে দারুণ এই সংযোজনটির সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।
ভাসমান পেয়ারা বাজারের অবস্থান
ভাসমান পেয়ারা বাজার বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। তিনটি খালের সঙ্গমস্থলে এই ভাসমান বাজার। ঝালকাঠি, বরিশাল এবং পিরোজপুরের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করায় এটি এশিয়ার বৃহত্তম পেয়ারা বাজার। বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের ২৬টি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার পরিবার নিজেদের জীবিকা নির্বাহের জন্য ৩১ হাজার একর জমিতে বিস্তৃত এই পেয়ারা বাগানের ওপর নির্ভরশীল।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের সেরা ১০টি প্রাকৃতিক ঝর্ণা, জলপ্রপাত কোথায়? কীভাবে যাবেন?
ভাসমান পেয়ারা বাজারের নামকরণ
২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ভাসমান পেয়ারা বাজারটি গড়ে উঠেছে। ঝালকাঠি ও পিরোজপুর সীমারেখায় অবস্থিত ছোট্ট গ্রামের নাম ভিমরুলি। এখানেই চর্তুমুখী ছোট-বড় খালের মোহনায় প্রতিদিন বিপণী শুরু হয়। তাই ভিমরুলি গ্রামটির নাম-ই শেষমেষ বাজারটির নামের সঙ্গে স্থায়ীভাবে জুড়ে যায়। স্থানীয় ব্যক্তিদের মুখে অবশ্য এই বাজারকে উদ্দেশ্য করে কথা বলার সময় গোইয়ার হাট নামটা শোনা যায়।
ভাসমান বিপণীর প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য
ছোট খাল জুড়ে সপ্তাহের প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাজার চলে। পেয়ারা বোঝাই শত শত নৌকা দেখলে বিস্ময়ে চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। ফল চাষিরা ফল দিয়ে নৌকা বোঝাই করে এবং ক্রেতাদের সন্ধান করে। ভিমরুলির আশেপাশের সব গ্রামেই অসংখ্য পেয়ারা বাগান রয়েছে। কৃষকরা এসব বাগান থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করে নৌকায় করে সরাসরি হাটে নিয়ে আসে। ভাসমান বাজারের উত্তর প্রান্তে খালের ওপর একটি ছোট সেতু আছে, যেটি এখানকার মূল আকর্ষণ। কেননা সেতু থেকে বাজারের পুরোটা খুব ভালোভাবে দেখা যায়।
মজার ব্যাপার হলো এই বাজারে পেয়ারা বহনকারী সব নৌকার নকশা ও আকার প্রায় একই। মনে হয় একই কারিগর সব নৌকা বানিয়েছে।
আরও পড়ুন: গরমকালে কম খরচে বাংলাদেশের কোথায় কোথায় ঘুরতে যাবেন?
পেয়ারা বাগানে প্রবেশের জন্য ছোট ছোট পরিখা করা হয়েছে। ছোট নৌকা নিয়ে সেখানে ঢুকে চাষিরা পেয়ারা পাড়েন। খাল সংলগ্ন প্রতিটি বাড়িতে একটি করে ডিঙ্গি নৌকা থাকে। স্থানীয়রা এগুলোকে কষা নৌকা বলে। এগুলো দিয়েই বাজার-হাট, যাতায়াত যাবতীয় কাজ করা হয়। ছোট নৌকাগুলো সরাসরি পরিখা দিয়ে বাগানে ঢুকে পড়তে পারে। বড়গুলোকে পাড়ে রেখে চাষিরা বাগানে নেমে পড়ে।
খাল সংলগ্ন বাড়িঘর, স্কুল, ব্রিজ, রাস্তাঘাটের দৃশ্য যে কাউকে বাংলার বুকে এক টুকরো থাইল্যান্ড বা ইতালির ভেনিসের অনুভূতি দেবে। আর মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলে কোনো ভ্রমণপিপাসু মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ার অবকাশ পাবেন না।
ভাসমান পেয়ারা বাজার ভ্রমণের উপযুক্ত সময়
ভিমরুলি বাজারে ব্যস্ততম সময় দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৩টা। এই সময়ে খালে নৌকা সংখ্যার চমকপ্রদভাবে বেড়ে যায়। এমনকি কয়েকশ ছাড়িয়ে যায়। সারা বছর ভাসমান বাজার বসলেও পেয়ারার মৌসুমে প্রাণ আসে। মৌসুম জুলাই ও আগস্ট মাস হলেও মাঝে মাঝে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাজার চলে। ভাসমান পেয়ারা বাজার ঘুরে আসার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় আগস্ট মাস। পেয়ারা বাজারের ভিড় বেলা ১১টার পর হালকা হয়ে যায়, তাই এর আগে বাজারে উপস্থিত থাকা ভালো।
আরও পড়ুন: ঢাকার কাছেই প্রকৃতির মাঝে ক্যাম্পিং সাইট
ঢাকা থেকে ভাসমান পেয়ারা বাজার যাবার উপায়
ঢাকা থেকে বরিশালে পৌঁছানোর জন্য সড়কপথ, নৌপথ দুইভাবেই যাওয়া যেতে পারে। তবে জলপথে ভ্রমণ সবচেয়ে আরামদায়ক, সুবিধাজনক এবং আনন্দদায়ক।
ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন বেশ কিছু লঞ্চ বরিশালের পথে যাতায়াত করে এবং ভোর ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে পৌঁছায়। ডেকের ভাড়া জন প্রতি ২০০ টাকা, যেখানে নন এসি সিঙ্গেল কেবিন ভাড়া ৯০০ টাকা এবং নন এসি ডাবল কেবিন ভাড়া ১৮০০ টাকা।
বরিশাল লঞ্চ ঘাট থেকে অটোরিকশার মাধ্যমে চৌরাস্তায় এসে তারপর বাসে স্বরূপকাঠি লঞ্চ ঘাটে যেতে হবে, যেখানে ভাড়া পড়বে ৫০ টাকা। স্বরূপকাঠি লঞ্চ ঘাট থেকে ট্রলার ভাড়া করে অপরূপ সন্ধ্যা নদী পেরিয়ে আটঘর, কুড়িয়ানা এবং ভীমরুলি বাজার ঘুরে দেখা যায়। ভালো দর কষাকষি করলে ১০০০ থেকে ২০০০ টাকায় ট্রলার ঠিক করে নেয়া যেতে পারে।
আরও পড়ুন: ঢাকার সেরা ১০টি জাদুঘর: ইতিহাস রোমন্থনের সঙ্গে জ্ঞান আহরণের অভাবনীয় সুযোগ
আরেকটি বিকল্প উপায় হচ্ছে- স্বরূপকাঠি লঞ্চঘাট থেকে ২০ টাকায় অটো ভাড়ায় কুরিয়ানা বাজারে পৌঁছা। তারপর সেখানকার আশেপাশের বাজার এবং খালগুলো দেখার জন্য ২০০ থেকে ৪০০ টাকায় নৌকা বা ট্রলার ভাড়া করা। তবে এ পথে ভিমরুলিতে গেলে ভাড়া বেশি পড়ে।
এছাড়া রাস্তা ভালো থাকলে অটোতে করে আটঘর, কুড়িয়ানা, ভিমরুলি বাজার ঘোরা যায়। তবে রাস্তা ও সেতুর অবস্থা ভালো কিনা তা এলাকাবাসীর কাছ থেকে জেনে নেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে অটোতে করে ব্রিজপ পর্যন্ত এসে সেখান থেকে পায়ে হেঁটে ব্রিজ পার হয়ে আবার অটো নিতে হবে।
আর বাসের পথটা এখন অনেকাংশে উন্নত হয়েছে। যে পথ অতিক্রমে আগে দুই দিন লাগতো পদ্মা সেতুর কল্যাণে সেই যাত্রা এখন একদিনেই শেষ করা যাবে। এমনকি পানিপথের প্রতিকূল আবহাওয়ার আশঙ্কায় পড়া লাগবে না। এখন ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু দিয়ে পিরোজপুর বাসে যেতে সময় লাগবে মাত্র ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা।
আরও পড়ুন: কমলদহ ও সহস্রধারা-২ ঝর্ণা ভ্রমণ গাইডলাইন: ভ্রমণপিপাসুদের প্রিয় ঝিরিপথ
অতঃপর পিরোজপুর থেকে ওপরে উল্লেখিত পথে ভিমরুলি চলে যাওয়া যাবে। অর্থাৎ খুব ভোরে রওনা হলে দুপুরেই মধ্যেই ভাসমান বাজারে পৌঁছে যাওয়া যাবে। অতঃপর ঘণ্টাখানেক সময় কাটিয়ে আবার রাতেই ঢাকায় ফেরা যাবে।
ভাসমান পেয়ারা বাজার ভ্রমণে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা
রাত্রি যাপন করতে হলে চলে আসতে হবে ঝালকাঠি শহরে। সেখানে ১০০ থেকে ২৫০ টাকায় মোটামুটি মানের আবাসিক হোটেল পাওয়া যায়। নদীর ধারে রাত্রিযাপন করতে চাইলে স্বরূপকাঠিতে নদীর ধারে হোটেল পাওয়া যাবে। তবে ভালো মানের হোটেল নির্বাচনের জন্য চলে যেতে হবে বরিশাল সদরে।
ভোজন রসিকদের জন্য ভিমরুলি দারুণ একটি জায়গা। এখানকার ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় খাবারের মধ্যে রয়েছে ভিমরুলি বাজারের সাদা ও লাল মিষ্টি, কুরিয়ানা বাজারের ঋতুপর্ণার গরম মিষ্টি, বউদির হোটেলে দুপুরের খাবার এবং গুঠিয়ার মিষ্টি। এ ছাড়া বটতলা এলাকার শশির রসোমালাই, নয়াবাজার মোড়ের নিতাইয়ের স্পঞ্জ মিষ্টি।
আরও পড়ুন: বান্দরবান ট্যুর গাইড: সেরা দর্শনীয় স্থানসমূহ
তাছাড়া বিবি পুকুর পাড়ের ছোটপটি, দধিঘরের দই, ঢেঁড়স, ও ঝোলা চালের মিশ্রণ লোকালয়ে বেশ জনপ্রিয়। সুযোগ পেলে বরিশাল শহরের পুরান বাজারে রসোমালাই, রসগোল্লা এবং ছানা চেখে দেখা যেতে পারে।
আশেপাশের দর্শনীয় স্থানসমূহ
ভাসমান পেয়ারা বাজার থেকে বরিশাল যাওয়ার পথে ঘুরে দেখা যেতে পারে গুঠিয়া মসজিদ এবং দুর্গাসাগর দীঘি। ২০০৮ সালে গুঠিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা, শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এস সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু নিজ উদ্যোগে গুঠিয়া মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের স্তম্ভগুলো কাবা শরীফ, মসজিদে নববী, যমযমের পবিত্র পানিসহ বিশ্বের পবিত্র স্থানগুলোর মাটি দিয়ে তৈরি।
১৭৮০ সালে চন্দ্রদ্বীপ পরগণার রাজা শিবনারায়ণ স্থানীয়দের পানির সংকট দূর করার জন্য মাধবপাশায় দুর্গাসাগর দীঘি খনন করেন। দীঘির কাছে ৩০০ বছরের পুরনো লাকুটিয়া জমিদার বাড়িটিও দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিত।
আরও পড়ুন: বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা ১০ শহর
কুড়িয়ানা বাজার থেকে জনপ্রতি ১৫ টাকায় অটোতে করে প্রথমে নারায়ণকাঠি নামতে হবে। সেখান থেকে অটো বদলে মাথাপিছু ১০ টাকা ভাড়ায় গুটিয়া মসজিদ যাওয়া যায়। সেখান থেকে দুর্গাসাগর দিঘীর দূরত্ব মাত্র দুই কিলোমিটার।
পরিশেষে
ভাসমান বাজারে নৌকায় ভেসে যাওয়ার সময় লাইফ জ্যাকেট পরে নেয়া ভালো। বাগান থেকে কিছু খেতে চাইলে বাগান মালিকের অনুমতি নিতে হবে। পানিতে ময়লা ফেলে খালের পরিবেশকে নষ্ট করা যাবে না।
শেষ কথা হচ্ছে, বরিশালের ভাসমান পেয়ারা বাজার দারুন একটি ডে-ট্যুর হতে পারে। গ্রাম্য চাষিদের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে যাওয়া নিমেষেই ভুলিতে দিতে পারে শহরের কৃত্রিম শপিং মলের যান্ত্রিকতা। আগস্টের যে কোনো ব্যস্ত দিনে দলবেধে হারিয়ে যাওয়া যেতে পারে এই অদ্ভুত কোলাহলে।
আরও পড়ুন: হাকালুকি হাওর ভ্রমণ: এক নিঃসীম জলজ মুগ্ধতা
১৪৫৮ দিন আগে