জনপ্রশাসন কর্মকর্তা
জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের জনগণের সেবক ও বন্ধু হওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা পরিহার করে জনগণের সেবক ও বন্ধু হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে বিয়াম ফাউন্ডেশনের প্রশিক্ষণ-কাম- ডরমিটরি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারাই নীতি নির্ধারণ এবং নীতি বাস্তবায়নের মধ্যে সেতুবন্ধন। আপনাদের সততা, কর্মদক্ষতা এবং দায়বদ্ধতাই সরকারের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি।’
কর্মকর্তাদের আরও বেশি জনবান্ধব মানসিকতা গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনাদের প্রতি আমার আহ্বান, নিজেদেরকে শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে নয়, বরং জনগণের সেবক এবং বন্ধু হিসেবে ভাবুন।’
প্রশাসনকে আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বিশ্ব এখন আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) যুগে প্রবেশ করেছে। সুতরাং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও সময়ের সঙ্গে মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুত রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের প্রশাসনকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক গড়ে তুলবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য ভবিষ্যতে সকল সরকারি সেবা তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে নাগরিকদের দৌড়গোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। এক্ষেত্রে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিয়ামের কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে সরকার বিয়ামকে আরও যেকোনো প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে প্রস্তুত।
অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ব ব্যবস্থায় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং সহজীকরণে সিঙ্গেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স, ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রতিষ্ঠা এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল কর্মপ্রবাহ তৈরি করে আধুনিক বিশ্বের উপযোগী করে সরকারি কর্ম সম্পাদন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং মানবিক। আমরা একটি বাংলাদেশ করতে চাই, যেখানে উন্নয়নের সফল সমাজের প্রতিটি স্তরে ধীরে ধীরে পৌঁছাবে, বৈষম্য কমে আসবে; একপর্যায়ে ইনশাআল্লাহ থাকবে না। নারী এবং যুব সমাজ উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং অবশ্যই পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সহনশীলতা আমাদের প্রতিটি নীতির অংশ হবে।’
প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘স্বচ্ছ, দক্ষ, জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। আমরা যদি প্রত্যাশিত বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চাই— আমি আশা করি, বিয়ামের কারিকুলাম ও প্রশিক্ষণ পরিবেশ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা সমস্যার সমাধানের ক্ষমতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
তিনি আরও বলেন, আধুনিক প্রশাসনের দক্ষতা মানে শুধু নিয়ম জানা নয়, বরং প্রযুক্তির ব্যবহার, তথ্য বিশ্লেষণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনসেবায় সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি। সেই লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও ফলাফলমুখী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। মৌলিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি উন্নত কোর্স, গবেষণা এবং নীতি নির্ধারণমূলক শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তারেক রহমান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসন আমলে আপনারা যথাযথভাবে সেই দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন কিনা কিংবা পালন করতে সক্ষম হয়েছিলেন কিনা— এই মুহূর্তে সেই প্রশ্ন না তুলে আমি আপনাদের বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষ থেকে একটি বার্তা দিতে চাই এবং তা হলো দেশ এবং জনগণের কাছে আমাদের যেই প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছি। এসব স্রেফ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং জনগণের সঙ্গে করা আমাদের চুক্তি। জনগণ আমাদের ইশতেহারের পক্ষে রায় দিয়েছে।
‘সুতরাং বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার নির্বাচনে ইশতেহার এবং জনগণের সামনে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের প্রতিটি তফা প্রতিটি অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে সরকার বদ্ধপরিকর। আমি আশা করি, আপনারা আপনাদের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে জনগণের কাছে দেওয়া সরকারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে ভূমিকা রাখবেন। জনগণ আমাদের উপর যে আস্থা রেখেছে, সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা এবং নৈতিকতার দৃঢ় চর্চা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক স্তরে অবস্থান করছেন। আপনারা যে দায়িত্ব পালন করেন, তা কেবল নথিপত্র পরিচালনা বা প্রশাসনিক তদারকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় অবশ্যই। বরং আপনার রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকারিতা, ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতার প্রধান ভিত্তি।
‘একটি শক্তিশালী জবাবদিহিমূলক আইনসম্মত এবং জনবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আপনারাই হচ্ছেন সেই মূল চালিকাশক্তি। যাদের পেশাদারিত্ব, দক্ষতা, নৈতিক দৃঢ়তা ও প্রশাসনিক প্রজ্ঞার উপরে একটি জাতির উন্নয়ন বা ভাগ্য নির্ভর করছে। আপনাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব কখনও একটি পরিবারে, কখনও একটি অঞ্চলে কিংবা কখনও পুরো জাতির ওপরে পড়ে। সেই কারণে আপনাদের দায়িত্ব স্রেফ প্রশাসক নয়, বরং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকার মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়োগ বদলি, পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা এগুলোকেই আমরা প্রধান বিবেচ্য হিসেবে গ্রহণ করতে চাই।
‘স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে শূন্য পদে সরকারি কর্মচারী নিয়োগ, প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন, শক্তিশালী পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন এবং বেসরকারি সার্ভিস রুল প্রণয়নসহ সর্বত্র প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেও সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেড় দশকেরও বেশি সময় পর দেশের মুক্তিকামী ও গণতন্ত্রকামী মানুষ সরাসরি ভোটের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার নির্বাচিত করেছে। বর্তমান সরকার সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, যারা দীর্ঘদিন ধরে একটি দায়বদ্ধ, ন্যায়পরায়ণ এবং জনকল্যাণমুখী শাসনব্যবস্থার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে জনগণই এই রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক।’
১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত বিয়াম প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ২০০২ সালের নভেম্বরে বিয়াম ফাউন্ডেশনে রূপান্তরিত হয়।
বিয়াম ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নবউদ্বোধিত ভবনটি তাদের প্রশিক্ষণ সক্ষমতা এবং আবাসন সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে।
৪ ঘণ্টা আগে
প্রশাসনের শীর্ষ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সর্বোচ্চ, কাজে স্থবিরতা
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে প্রশাসনের শীর্ষ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। জনপ্রশাসনে শীর্ষ কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ থামছে না। মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সংস্থায় শীর্ষ পদে বা সচিব ও সমমর্যাদার পদে ধারাবাহিকভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
এতে নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে পদোন্নতির সুযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পদোন্নতির স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে এবং কর্মস্পৃহা ও উদ্দীপনা কমে যাচ্ছে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চুক্তিতে থাকা কর্মকর্তাদের নিয়োগ বাতিল করলেও বর্তমান সরকার নিজেরাই একের পর এক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে চলেছে। বাড়ছে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) সংখ্যা, যার ফলে সরকারের অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে, নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ জমছে।
প্রেক্ষাপট
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। ওই দিনই মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত হয়। পরদিন, ৬ আগস্ট দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি। এরপর ৮ আগস্ট শপথ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এর পর থেকেই প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বৃদ্ধি পেতে থাকে।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যারা দীর্ঘদিন চাকরি থেকে বাইরে ছিলেন, দীর্ঘ ৭/৮ বছর পর তাদের হঠাৎ চুক্তিতে ফিরিয়ে আনা হলে কাজ বোঝার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়। ফলে মন্ত্রণালয়ের স্বাভাবিক কাজের গতি কমে গেছে। এছাড়াও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কারণে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
আরও পড়ুন: বাধ্যতামূলক অবসরে ২২ ডিসি: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে সচিব, সিনিয়র সচিব ও সমমর্যাদার পদ রয়েছে ৮৪টি। এর মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিবসহ সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে ১৭ জন কর্মকর্তা চুক্তিতে রয়েছেন। এর আগে শীর্ষ পদে একসঙ্গে এতসংখ্যক কর্মকর্তা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাননি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে মোট ওএসডি আছেন ১২ জন। তবে বর্তমানে অন্যান্য পদে প্রশাসনে সবমিলিয়ে প্রায় ৫ শতাধিকের উপরে ওএসডি কর্মকর্তা রয়েছেন।
বর্তমানে শীর্ষ পদে যারা চুক্তিতে আছেন
৫ আগস্টের পর যারা চুক্তিতে, যেসকল কর্মকর্তা রয়েছেন তাদের মধ্য, মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশিদ, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্যসচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসিমুল গনি, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) এমএ আকমল হোসেন আজাদ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমান, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক, নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. নেয়ামত উল্লাহ ভূঁইয়া, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব সিদ্দিক জোবায়ের, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ।
এ ছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী, ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান (সচিব) এজেএম সালাহউদ্দিন নাগরী, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) কাইয়ুম আরা বেগম, বিশ্বব্যাংকে বিকল্প নির্বাহী পরিচালক শরীফা খান, সচিব মর্যাদায় পর্তুগালে বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত মো. মাহফুজুল হক চুক্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন।
চুক্তি বাড়ার কারণ হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা ইউএনবিকে জানান, আওয়ামীলীগ সরকারের দীর্ঘ সময় শীর্ষ পদে থাকা বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে ওএসডি থাকতে হচ্ছে। তাদের বছরের পর বছর পদোন্নতি দেয়নি। তাদের সময়ে সময়ে দলীয়করণ ও নিয়ম-নীতিহীন পদায়ন-পদোন্নতির কারণে নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। ফলে গত সরকারের সময়ে বঞ্চিত আমলাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হয়। যে কারণে পট পরিবর্তনের পর পরিস্থিতির প্রয়োজনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বেড়েছে।তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ কমে যাবে
এসব কর্মকর্তা আরও জানান, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী আমলাদের ওএসডি করা হয়, অনেককে আবার বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ বিষয়ে- ‘বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী ঐক্য ফোরাম’- এর সভাপতি সাবেক সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার ইউএনবিকে বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ভারে প্রশাসন ন্যুব্জ। ফ্যাসিস্ট আমলেও মতোই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারা অব্যাহত রেখেছে।
আরও পড়ুন: জনপ্রশাসন সংস্কার নিয়ে থাকছে শতাধিক সুপারিশ: কমিশন প্রধান
‘এমনকি ফ্যাসিস্ট সরকারের দেওয়া চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হবে এই মর্মে ঘোষণা দিয়েও কোনো কোনো কর্মকর্তার চুক্তি অব্যাহত রেখেছে। চুক্তি বাতিল করে আবার নতুন করে একই ব্যক্তিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে,’ যোগ করেন তিনি।
‘কোনো কোনো পদে পূর্ব পরিচয়, বিশেষ যোগসূত্র বা অজ্ঞাত কারণে কোনো প্রক্রিয়ায় অনুসরণ ব্যতিরেখে ভিনদেশী নাগরিককেও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে বর্তমান সরকার। আবার কোনো কোনো পদে ফ্যাসিস্ট সহযোগী, বিতর্কিত ও ১/১১ এর দোসর কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’
সাবেক এই সচিব বলেন, এসব কর্মকর্তা দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির করার কাজে সচেষ্ট আছে। শুধু তাই নয়, ক্ষেত্রে বিশেষ উপদেষ্টাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তাদের লক্ষ্য প্রশাসন ও সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে নির্বাচন বিলম্বিত করা ও অনৈতিক ফয়দা লাভ করা। কাজেই অবিলম্বে সকল চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসনকে গতিশীল করা ও আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু-নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সকল চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। সিভিল প্রশাসনে কর্মরত ক্যাডার, নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে যারা ফ্যাসিস্টদের দোসর ও দুর্নীতি পরায়ন তাদেরকে অবিলম্বে চাকরি থেকে অপসারণ এবং আইনের আওতায় আনতে হবে।
একই বিষয়ে সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার ইউএনবিকে বলেন, ‘চুক্তিতে বেশি নিয়োগ দিলে যারা নিচ থেকে ওপরে উঠে আসার জন্য অপেক্ষা করছেন, তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। তাই চুক্তি কমিয়ে আনতে হবে। অন্যদিকে ওএসডি ব্যবস্থা, সেটি পৃথিবীর কোনো দেশে নেই। এটি শুধু আমাদের দেশে। আর ওএসডি সরকারের একটি মহা অপচয়। ওএসডি ব্যবস্থায় মূলত কোনো কাজ করানো ছাড়াই এই বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিতে হচ্ছে সরকারকে। এই ব্যয় এক ধরনের অপচয়ের শামিল।
১২ জন ওএসডি সচিব
১২ জন ওএসডি সিনিয়র সচিবদের মধ্যে রয়েছেন মো. মোস্তফা কামাল, মো. মশিউর রহমান ও মো. মনজুর হোসেন। সচিব হিসেবে ওএসডি আছেন মো. সামসুল আরেফিন, মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন, মো. আজিজুর রহমান, মো. নুরুল আলম, মো. খায়রুল আলম শেখ, ফরিদ উদ্দিন আহমদ, রেহানা পারভীন, শফিউল আজিম ও একেএম মতিউর রহমান।
সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) ওএসডি আওয়ামী লীগের আমলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এমন ৩৩ কর্মকর্তাকে গত ১৯ জানুয়ারি ওএসডি করা হয়, যারা যুগ্মসচিব হিসেবে বিভিন্ন দপ্তরে দায়িত্ব পালন করছিলেন। একই কারণে এর আগে ১২ কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়। আর বিতর্কিত নির্বাচনে ডিসি ও এসপি থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে যাদের চাকরির বয়স ২৫ বছর বা এর বেশি, তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। সেই অনুযায়ী ২০ জানুয়ারি ২২ জন সাবেক ডিসিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
আরও পড়ুন: সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদের দুই দিনের রিমান্ড
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে নিয়োগ পদোন্নতি শাখা থেকে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার আমলে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে বিএনপি-জামাত ট্যাগ লাগিয়ে বহু কর্মকর্তাকে বছরের পর বছর ওএসডি করে রাখা হয়। অনেককেই ওই অবস্থায়ই নীরবে চোখের জল ফেলে চাকরি থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার গত ১৬ বছরে কোনো নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক বিবেচনায় এসব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যেখানে চাকরির মেয়াদ শেষে আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের পুরস্কার ছিল এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ।
৩৬৭ দিন আগে