কুষ্ঠ হাসপাতাল
দেশের বৃহত্তম কুষ্ঠ হাসপাতাল এখন নিজেই ‘রোগী’
দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও বৃহত্তম সিলেট কুষ্ঠ হাসপাতালটি বর্তমানে এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে যে, নিজেই যেন এক দণ্ডায়মান ‘রোগী। ভবনের যত্রতত্র ফাটল, ছাদ চুইয়ে পড়া বৃষ্টির পানি এবং খসে পড়া পলেস্তারা হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রোগীদের জন্য পদে পদে বিপদের আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। শৌচাগারে দরজা নেই, চিকিৎসার ব্যবহৃত সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে পড়েছে—সব মিলিয়ে হাসপাতালটির অবস্থা তথৈবচ।
১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত সিলেট কুষ্ঠ হাসপাতাল দেশের তিনটি বিশেষায়িত সরকারি কুষ্ঠ হাসপাতালের মধ্যে সর্ববৃহৎ। হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৮০ হলেও বর্তমানে কার্যকর রয়েছে মাত্র ৪৮টি।
গত ২৪ জানুয়ারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনটি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৯ জন এবং প্রতিদিন গড়ে ১৫–২০ জন রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের তিনটি শৌচাগারে দরজা নেই, রোগী দেখার জন্য ব্যবহৃত মনিটরগুলো নষ্ট, বাথরুমগুলো নোংরা। মূল ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় ঝুঁকি নিয়েই সেখানে চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে। ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে।
হাসপাতালের কর্মীরা জানান, বৃষ্টি এলে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। এ কারণে সবাই আতঙ্কে থাকেন।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান বিষয়ক কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম জানান, ২০২০ সালে জেলায় কুষ্ঠরোগী ছিলেন ২০ জন। পরবর্তী বছরগুলোতে যথাক্রমে ৩৭ (২০২১), ৩৫ (২০২২), ৭৯ (২০২৩), ৫৯ (২০২৪) ও ৫৮ (২০২৫) জন রোগী এই হাসপাতালে ভর্তি হন।
চিকিৎসকরা বলছেন, কুষ্ঠরোগ ছোঁয়াচে নয়, মৃদু সংক্রামক। জীবাণুর মাধ্যমে এর সংক্রমণ হয়। এ জীবাণু হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়। প্রথমে চামড়ায় হালকা ফ্যাকাশে বাদামি বা লালচে অনুভূতিহীন দাগ, যেখানে চুলকায় না, ঘামে না এবং ওই স্থানে লোম থাকে না।
মুখে, ঘাড়ে বা বুকে-পিঠে ব্যথাহীন দানা বা গুটি, কানের লতি ফুলে যাওয়া, হাত-পা চোখে অনুভূতি না পেলে দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা জানান তারা।
সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন জন্মেজয় দত্ত বলেন, কুষ্ঠরোগী বেশি শনাক্ত হচ্ছেন, এর মানে এই নয় যে রোগের সংক্রমণ বাড়ছে। আগেও অনেকে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হতেন, তবে তারা শনাক্ত হতেন না। এখন মানুষের সচেতনতা বাড়ছে, তারা চিকিৎসা নিতে আসছেন।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে কুষ্ঠরোগ নির্মূল করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য বিভাগ এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সমন্বয়ে কার্যক্রম বাড়ানোয় সুফল এসেছে।
মো. মনিরুল ইসলাম জানান, ৪ দশমিক ৭২ একর জমিতে ১৮৯০ সালে হাসপাতালটি কার্যক্রম শুরু করে। এর দীর্ঘ সময় পর ১৯৬৩ সালে তিনতলা ফাউন্ডেশনের ভবনটির একতলা নির্মিত হয়, পরে ধীরে ধীরে সেটিকে তিনতলায় উন্নীত করা হয়। ফলে বিল্ডিংটি অনেক পুরাতন এবং অবস্থা খুবই খারাপ। বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালেও ভবন পুনর্নিমাণ বা সংস্কারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।
হাসপাতালের প্রধান সহকারী সাব্বির আহমেদ বলেন, বৃষ্টির দিনে দেওয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়তে শুরু করে। খুবই বিপদজনক ভবনে পরিণত হয়েছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুঘটনা ঘটতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৭০ বছর বয়সী এক রোগী বলেন, ‘আমার হাত পচে গেছিল। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাইরে করাইছি। এখানে কোনো ব্যবস্থা নাই।’
৬৫ বছর বয়সী আরেক রোগী বলেন, ‘শরীরে চামড়ায় প্রথমে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া দাগ দেখা যায়। পরে সেটি কুষ্ঠরোগ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। এখানে ১৪ দিন আগে ভর্তি হয়েছি। সারা দিনে চিকিৎসক মাত্র একবার আসেন। অন্যদিকে, বিল্ডিংয়ে থাকতে ভয় লাগে। যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।’
হাসপাতালের বহির্বিভাগের রোগী আক্তার হোসেন জানান, তারা যখন হাসপাতালে থাকেন, তখন চোখ থাকে মাথার ওপর; কখন ছাদ থেকে কিছু খুলে পড়ে।
হাসপাতালটিতে ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও এর বিপরীতে কার্যক্রম চালাচ্ছেন মাত্র ২৯ জনে। কুষ্ঠরোগীদের জন্য বিশেষ জুতা তৈরির জন্য একজন কর্মী থাকার কথা হাসপাতালে, এই পদটি ২০২১ সাল থেকে শূন্য। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংখ্যাও কম।
হাসপাতালের একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বলেন, আগে আমরা ছয়জন কাজ করেও সামাল দেওয়া যেত না। অথচ এখন আছে মোটে চারজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কর্মচারী বলেন, হাসপতালের রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা একেবারেই বন্ধ। জনবল না থাকায় ইনডোরের রোগীরা সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিগুলো অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
সিলেট কুষ্ঠ হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. নাহিদ রহমান বলেন, বাংলাদেশে তিনটি কুষ্ঠ রোগের হাসপাতালের মধ্যে সিলেটের হাসপাতালটি সবচেয়ে বড়। অথচ এই হাসপাতালের অবস্থা খুবই করুন। আমরা আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার জানিয়েছি, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না।
৫ ঘণ্টা আগে