সামরিক থিংকট্যাঙ্ক
২০২৬ সালজুড়ে ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে রাশিয়া: সামরিক থিংকট্যাঙ্ক
অর্থনৈতিক চাপ ও জনবল সংকটের লক্ষণ দেখা দিলেও ২০২৬ সালজুড়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাশিয়ার এখনও রয়েছে বলে জানিয়েছে শীর্ষ আন্তর্জাতিক সামরিক থিংকট্যাঙ্ক আইআইএসএস। একইসঙ্গে ইউরোপের জন্য রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হুমকি বাড়ছে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, মস্কোর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা কমে গেছে—এমন কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নেই। বরং রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হুমকি ক্রমশ বাড়ছে। এমনকি ইউক্রেনকে অর্থনৈতিক ও জনবলর চাপের মধ্যেও ফেলতে পারে রাশিয়া।
আইআইএসএসের মহাপরিচালক বাস্তিয়ান গিগেরিশ বলেছেন ‘যুদ্ধের পঞ্চম বছরে রাশিয়ার ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা কমে গেছে—এমন ইঙ্গিত খুব কম পাওয়া যাচ্ছে।’
থিংকট্যাঙ্কটির তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে প্রতিরক্ষায় রাশিয়ার ক্রেমলিন অন্তত ১৮৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে যা এর সাধরণ ব্যয়ের চেয়ে ৩ শতাংশ বেশি। এটি দেশটির জিডিপির ৭ দশমিক ৩ শতাংশ যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের দ্বিগণেরও বেশি এবং যুক্তরাজ্যের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।
থিঙ্কট্যাঙ্কটির প্রতিরক্ষা অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ফেনেলা ম্যাকগার্টি তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, রাশিয়ার অর্থনীতির গতি কমছে, ফলে ২০২৬ সালে প্রকৃত অর্থে সামরিক ব্যয় কিছুটা কমতে পারে। তবে গত কয়েক বছরের বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বিষয়টি দেখতে হবে।’
ওই প্রতিবেদনে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ‘২০২১ সালের পর থেকে রাশিয়ার সামরিক ব্যয় বাস্তবিক অর্থে দ্বিগুণ হয়েছে। এর ফলে রাশিয়া সামরিক সরঞ্জাম ও জনবল নিয়োগে বেশি ব্যয় করতে পারছে এবং অদূর ভবিষ্যতেও রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর স্থল ও আকাশপথে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যেতে সক্ষম হবে।’
চার বছর আগে ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে পূর্ণ মাত্রায় আগ্রাসন শুরু করেন। এই আগ্রাসনে রাশিয়ার প্রতিবেশী ছোট এই দেশটি ভেঙে না পড়লেও এতে ১২ লাখের বেশি লোক হতাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তা সত্ত্বেও লড়াই চালিয়ে যেতে পারে রাশিয়া।
গিগেরিশ বলেন ‘একটি টেকসই যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পর্কে পশ্চিমাদের আলোচনা চললেও রাশিয়া ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং একমুখী আক্রমণকারী ড্রোনের মাধ্যমে ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও জনবসতিতে হামলা আরও জোরদার করেছে।’
আইআইএসএসের রাশিয়া বিশেষজ্ঞ এবং বেলারুশে যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত নাইজেল গুল্ড ডেভিস বলেন এমন অনেক লক্ষণ স্পষ্ট হচ্ছে যেখানে দেখা যাচ্ছে রাশিয়ার মাসিক সৈন্য নিয়োগের হার যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের প্রাণহানির তুলনায় কমে আসছে।’ তবে তিনি এও উল্লেখ করেন যে, ইউক্রেনজুড়ে সম্মুখ সমরে আক্রমণের তীব্রতা কমিয়ে মস্কো তাদের এই ক্ষয়ক্ষতির হার কমিয়ে আনার সক্ষমতা রাখে।
তিনি আরও বলেন, ‘রাশিয়া তাদের সামরিক খাতে প্রতি মাসে ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার জনবল নিয়োগ দিচ্ছে। তবে নিয়োগপ্রাপ্তদের মান কমছে, কারণ এখন মদ্যপ, মাদকাসক্ত ও অসুস্থ লোকদেরও নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।’
এদিকে, রাশিয়ার আক্রমণে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব রয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর মাসে ৩৫ হাজার ৩০ জন এবং এ বছরের জানুয়ারিতে ৩১ হাজার ৭১৩ জন হতাহত হয়েছে।
থিংকট্যাঙ্কটি জানিয়েছে, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মস্কো নতুন রণকৌশল, ক্ষেপণাস্ত্র ও হামলায় সক্ষম ড্রোন তৈরি করছে। এর মধ্যে আধুনিক শাহেদ-১৩৬ ড্রোনও রয়েছে যা ইউরোপজুড়ে ২ হাজার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম।
গিগেরিশ বলেন ‘রাশিয়ার এ ধরনের উদ্যোগ ন্যাটোর জন্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ও ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, গত সেপ্টেম্বরে পোল্যান্ডের আকাশসীমায় ২১টি রুশ ড্রোন ঢুকে পড়ে। যার ফলে বেশ কয়েকটি বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যায় এবং তিনটি অঞ্চলের মানুষ ঘরের ভেতরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
রাশিয়ার হুমকির জবাবে ইউরোপের ন্যাটো সদস্য ও কানাডা ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে আইআইএসএস তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন ‘দ্য মিলিটারি ব্যালান্স’-এ বলেছে এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ও বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে যা অনেক দেশের জন্য কঠিন হবে।
গিগেরিশ বলেন, ‘সামরিক গোয়েন্দা তথ্য, ক্লাউড কম্পিউটিং ও মহাকাশ সম্পদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে ইউরোপের দেশগুলোর ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।’ এর পাশাপাশি বিমান প্রতিরক্ষা উন্নত করাও ইউরোপীয় দেশগুলোর অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
১০০ দিন আগে