জনগণের সেবক
জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের জনগণের সেবক ও বন্ধু হওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা পরিহার করে জনগণের সেবক ও বন্ধু হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে বিয়াম ফাউন্ডেশনের প্রশিক্ষণ-কাম- ডরমিটরি ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারাই নীতি নির্ধারণ এবং নীতি বাস্তবায়নের মধ্যে সেতুবন্ধন। আপনাদের সততা, কর্মদক্ষতা এবং দায়বদ্ধতাই সরকারের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি।’
কর্মকর্তাদের আরও বেশি জনবান্ধব মানসিকতা গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনাদের প্রতি আমার আহ্বান, নিজেদেরকে শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে নয়, বরং জনগণের সেবক এবং বন্ধু হিসেবে ভাবুন।’
প্রশাসনকে আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বিশ্ব এখন আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) যুগে প্রবেশ করেছে। সুতরাং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও সময়ের সঙ্গে মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুত রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের প্রশাসনকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক গড়ে তুলবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য ভবিষ্যতে সকল সরকারি সেবা তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে নাগরিকদের দৌড়গোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। এক্ষেত্রে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিয়ামের কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে সরকার বিয়ামকে আরও যেকোনো প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে প্রস্তুত।
অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ব ব্যবস্থায় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং সহজীকরণে সিঙ্গেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স, ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রতিষ্ঠা এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল কর্মপ্রবাহ তৈরি করে আধুনিক বিশ্বের উপযোগী করে সরকারি কর্ম সম্পাদন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং মানবিক। আমরা একটি বাংলাদেশ করতে চাই, যেখানে উন্নয়নের সফল সমাজের প্রতিটি স্তরে ধীরে ধীরে পৌঁছাবে, বৈষম্য কমে আসবে; একপর্যায়ে ইনশাআল্লাহ থাকবে না। নারী এবং যুব সমাজ উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং অবশ্যই পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সহনশীলতা আমাদের প্রতিটি নীতির অংশ হবে।’
প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘স্বচ্ছ, দক্ষ, জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। আমরা যদি প্রত্যাশিত বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চাই— আমি আশা করি, বিয়ামের কারিকুলাম ও প্রশিক্ষণ পরিবেশ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা সমস্যার সমাধানের ক্ষমতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
তিনি আরও বলেন, আধুনিক প্রশাসনের দক্ষতা মানে শুধু নিয়ম জানা নয়, বরং প্রযুক্তির ব্যবহার, তথ্য বিশ্লেষণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনসেবায় সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি। সেই লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও ফলাফলমুখী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। মৌলিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি উন্নত কোর্স, গবেষণা এবং নীতি নির্ধারণমূলক শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তারেক রহমান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসন আমলে আপনারা যথাযথভাবে সেই দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন কিনা কিংবা পালন করতে সক্ষম হয়েছিলেন কিনা— এই মুহূর্তে সেই প্রশ্ন না তুলে আমি আপনাদের বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষ থেকে একটি বার্তা দিতে চাই এবং তা হলো দেশ এবং জনগণের কাছে আমাদের যেই প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছি। এসব স্রেফ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং জনগণের সঙ্গে করা আমাদের চুক্তি। জনগণ আমাদের ইশতেহারের পক্ষে রায় দিয়েছে।
‘সুতরাং বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার নির্বাচনে ইশতেহার এবং জনগণের সামনে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের প্রতিটি তফা প্রতিটি অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে সরকার বদ্ধপরিকর। আমি আশা করি, আপনারা আপনাদের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে জনগণের কাছে দেওয়া সরকারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে ভূমিকা রাখবেন। জনগণ আমাদের উপর যে আস্থা রেখেছে, সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা এবং নৈতিকতার দৃঢ় চর্চা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক স্তরে অবস্থান করছেন। আপনারা যে দায়িত্ব পালন করেন, তা কেবল নথিপত্র পরিচালনা বা প্রশাসনিক তদারকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় অবশ্যই। বরং আপনার রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকারিতা, ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতার প্রধান ভিত্তি।
‘একটি শক্তিশালী জবাবদিহিমূলক আইনসম্মত এবং জনবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আপনারাই হচ্ছেন সেই মূল চালিকাশক্তি। যাদের পেশাদারিত্ব, দক্ষতা, নৈতিক দৃঢ়তা ও প্রশাসনিক প্রজ্ঞার উপরে একটি জাতির উন্নয়ন বা ভাগ্য নির্ভর করছে। আপনাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব কখনও একটি পরিবারে, কখনও একটি অঞ্চলে কিংবা কখনও পুরো জাতির ওপরে পড়ে। সেই কারণে আপনাদের দায়িত্ব স্রেফ প্রশাসক নয়, বরং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকার মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়োগ বদলি, পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা এগুলোকেই আমরা প্রধান বিবেচ্য হিসেবে গ্রহণ করতে চাই।
‘স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে শূন্য পদে সরকারি কর্মচারী নিয়োগ, প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন, শক্তিশালী পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন এবং বেসরকারি সার্ভিস রুল প্রণয়নসহ সর্বত্র প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেও সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেড় দশকেরও বেশি সময় পর দেশের মুক্তিকামী ও গণতন্ত্রকামী মানুষ সরাসরি ভোটের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার নির্বাচিত করেছে। বর্তমান সরকার সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, যারা দীর্ঘদিন ধরে একটি দায়বদ্ধ, ন্যায়পরায়ণ এবং জনকল্যাণমুখী শাসনব্যবস্থার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে জনগণই এই রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক।’
১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত বিয়াম প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ২০০২ সালের নভেম্বরে বিয়াম ফাউন্ডেশনে রূপান্তরিত হয়।
বিয়াম ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নবউদ্বোধিত ভবনটি তাদের প্রশিক্ষণ সক্ষমতা এবং আবাসন সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে।
৪ ঘণ্টা আগে