বায়ুশক্তি
আফ্রিকাজুড়ে ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি
আফ্রিকা মহাদেশজুড়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো ক্রমেই সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং ব্যাটারি স্টোরেজকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। কয়লা ও বড় জলবিদ্যুৎ বাঁধের পরিবর্তে সরকার ও বিনিয়োগকারীরা এখন সস্তা, দ্রুততর এবং আরও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুতের সন্ধানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছেন।
এই পরিবর্তনের স্পষ্ট প্রমাণ মেলে চলতি মে মাসের শুরুতে চীন ও জাম্বিয়ার মধ্যে সম্পাদিত ১৫০ কোটি ডলারের একটি জ্বালানি চুক্তিতে, যেখানে সৌর, বায়ু ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ৩টি পৃথক ৩০০ মেগাওয়াট প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চুক্তিতে কয়লার উপস্থিতি মহাদেশটির স্থিতিশীল বেসলোড বিদ্যুতের চাহিদাকে তুলে ধরলেও ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি ব্যয়, অনির্ভরযোগ্য গ্রিড এবং ক্রমবর্ধমান শিল্প চাহিদার মুখে আফ্রিকার দেশগুলো এখন এমন নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের দিকে ঝুঁকছে, যেগুলো প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় দ্রুত ও কম খরচে স্থাপন করা সম্ভব।
সৌর ও বায়ুশক্তির জনপ্রিয়তা
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইলেকট্রন ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আফ্রিকায় ঘোষিত ৩২২টি জ্বালানি প্রকল্পের মধ্যে ১৭৩টিই ছিল সৌরশক্তি প্রকল্প। এরপরে রয়েছে জলবিদ্যুৎ ৪৬টি, বায়ুশক্তি ৩৪টি, গ্যাস ২২টি এবং হাইব্রিড জ্বালানি প্রকল্প ১৪টি।
কেনিয়ার আর্থিক খাতের টেকসই উন্নয়নবিষয়ক ট্রাস্ট ‘এফএসডি কেনিয়া’র জলবায়ু অর্থায়ন প্রধান মুগওয়ে মাঙ্গা বলেন, ‘আফ্রিকা বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরের প্রান্তে নয়, বরং এর কেন্দ্রে রয়েছে। এই মহাদেশে বিশ্বের সেরা নবায়নযোগ্য সম্পদ রয়েছে এবং অর্থনীতি এখন স্পষ্টভাবে পরিষ্কার জ্বালানির পক্ষে ঝুঁকে গেছে।’
আফ্রিকা মিনিগ্রিড ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এএমডিএ) প্রধান নির্বাহী ওলামিদে নিয়ি-আফুয়ে বলেন, মহাদেশটি জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নের ধরনে একটি ব্যাপক কৌশলগত পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে দ্রুত স্থাপনযোগ্য এবং নমনীয় অর্থায়নের মাধ্যমে ধাপে ধাপে সম্প্রসারণযোগ্য ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। মিনি-গ্রিড ব্যবস্থায় সৌরশক্তির ক্রমবর্ধমান ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থার (আইআরইএনএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আফ্রিকা রেকর্ড ১১ দশমিক ৩ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সংযোজন করেছে যা আগের বছরের তিনগুণ। এই প্রবৃদ্ধির বড় একটি অংশ এসেছে দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর ও ইথিওপিয়া থেকে।
খরচ কম
প্রযুক্তির ক্রমহ্রাসমান মূল্যও এতে বড় ভূমিকা রাখছে। ২০১০ সাল থেকে বৈশ্বিকভাবে ইউটিলিটি-স্কেল সৌরবিদ্যুতের খরচ প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে, আর স্থলভিত্তিক বায়ুশক্তির খরচ কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। ফলে আফ্রিকার অনেক বাজারে নবায়নযোগ্য জ্বালানিই এখন নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে সস্তা উৎস।
আফ্রিকায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ক্রসবাউন্ডারি এনার্জির প্রধান নির্বাহী ম্যাট টিলার্ড বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন নিঃসন্দেহে মানুষ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতিকে প্রয়োজনীয় মেগাওয়াটের সঙ্গে সংযুক্ত করার সবচেয়ে দ্রুত, সস্তা ও বিনিয়োগযোগ্য পথ।’
প্রবৃদ্ধির বড় একটি অংশ আসছে বিতরণমূলক সৌর ও ব্যাটারি সিস্টেম থেকে, যেগুলো সরাসরি খনি, কারখানা, টেলিযোগাযোগ টাওয়ার এবং বাড়িতে স্থাপন করা হচ্ছে।
টিলার্ড বলেন, বেশিরভাগ সরকারি পরিসংখ্যান এখনও পুরনো পদ্ধতিতে জ্বালানি রূপান্তর পরিমাপ করে; জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত মেগাওয়াট গণনা করে। কিন্তু সৌর ও ব্যাটারির জন্য কেন্দ্রীয় ইউটিলিটির প্রয়োজন নেই।
আফ্রিকা সোলার ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য দেখাচ্ছে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ আফ্রিকায় ২৩ দশমিক ৪ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু রয়েছে বলে নথিভুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে, চীনের রপ্তানি পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০১৭ সাল থেকে আফ্রিকান দেশগুলোতে ৫৮ দশমিক ১ গিগাওয়াটের সৌরপ্যানেল রপ্তানি হয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয় সরকারি হিসাবে যা ধরা পড়ছে, বাস্তবে সৌরশক্তির প্রসার তার চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে হচ্ছে।
দ্রুত মুনাফা
বিনিয়োগকারীরা ক্রমেই নবায়নযোগ্য প্রকল্পে আগ্রহী হচ্ছেন, কারণ এগুলো দ্রুত মুনাফা দেয় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের ওঠানামার ঝুঁকিও হ্রাস করে।
নিয়ি-আফুয়ে বলেন, ‘সৌর ও বায়ু প্রকল্পগুলো এই মুহূর্তে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়, কারণ এগুলো শক্তিশালী বাণিজ্যিক ভিত্তি এবং তুলনামূলকভাবে কম বিনিয়োগ ঝুঁকির মধ্যে সমন্বয় করে।’
কঙ্গোর কামোয়া-কাকুলা তামার খনি কমপ্লেক্সে ক্রসবাউন্ডারি এনার্জি ২৩৩ মেগাওয়াটের একটি সৌর ও ব্যাটারি প্রকল্প নির্মাণ করছে, যা আফ্রিকার অন্যতম বৃহত্তম তামার খনিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে।
টিলার্ড জানান, চুক্তি সই থেকে মাত্র এক বছরের মধ্যে প্রকল্পটির ৮০ শতাংশেরও বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর তুলনায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ১২ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে এবং বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায়ই এক দশক বা তারও বেশি সময় লেগে যায়।
টিলার্ড বলেন, ‘অথচ, সৌর ও ব্যাটারি প্রকল্পে বিনিয়োগকারীরা মূলধন খাটানোর মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে উপার্জন শুরু করেন।’
নীতি পরিবর্তন সহায়ক হলেও রয়েছে চ্যালেঞ্জ
নীতিগত পরিবর্তনও মহাদেশটির নবায়নযোগ্য জ্বালানির অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করছে। ইথিওপিয়া প্রথম দেশ হিসেবে পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনচালিত যানবাহন আমদানি নিষিদ্ধ করেছে, যা বৈদ্যুতিক যানবাহনের দ্রুত গ্রহণকে উৎসাহিত করছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্যক্তিগত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সীমা শিথিল করায় শিল্পখাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের জোয়ার এসেছে।
তবে বড় বাধাগুলো এখনও রয়ে গেছে। আফ্রিকার অনেক বিদ্যুৎ ইউটিলিটি আর্থিক সংকটে রয়েছে, ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করতে ঋণদাতারা সতর্ক থাকছেন।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশ-ঝুঁকির ধারণার কারণে আফ্রিকায় নবায়নযোগ্য প্রকল্পে অর্থায়নের খরচ উন্নত অর্থনীতির তুলনায় তিনগুণ পর্যন্ত বেশি।
তবে আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনসহ (আইএফসি) উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলো রেয়াতমূলক ঋণ, গ্যারান্টি ও ঝুঁকি-ভাগাভাগির কাঠামোর মাধ্যমে এই ব্যবধান পূরণে সহায়তা করছে।
মাঙ্গা বলেন, ‘যা বাকি আছে তা আর প্রযুক্তি বা খরচের প্রশ্ন নয়। এটি এখন অর্থায়ন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং মহাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা তৈরি করতে পারে—এমন বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প প্রস্তুতের প্রশ্ন।’
৩ ঘণ্টা আগে