রক্ষণশীল ইহুদি
বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে যোগদানের বিরোধিতায় ইসরায়েলজুড়ে বিক্ষোভ
ইসরায়েলে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার রক্ষণশীল ইহুদি। এ সময় তারা বিভিন্ন স্থানে তারা সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন, যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে ইসরায়েলজুড়ে জনজীবন ও পরিবহন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সময় সোমবার (২ জুন) ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিব ও জেরুজালেমের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীরা ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় একটি বিক্ষোভস্থলে এক সেনাসদস্যের ওপর হামলা করে বিক্ষুদ্ধ জনতা। সে সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে জলকামান ও ঘোড়া ব্যবহার করতে হয়েছে।
এই বিক্ষোভের ফলে ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় অঞ্চলগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ে। জেরুজালেম ও তেল আবিব মহানগর এলাকায় বিশাল জনসমাগমের কারণে বেশ কয়েকটি মহাসড়ক বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি সেখানে গণপরিবহন চলাচলও সাময়িকভাবে স্থগিত ছিল।
ইসরায়েলে অধিকাংশ ইহুদি নারী ও পুরুষের জন্য সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক। তবে দীর্ঘদিন ধরে সেখানে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী রক্ষণশীল ইহুদিরা এই বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পেয়ে আসছেন। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন পড়াশোনা করতে এই সম্প্রদায়কে সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের যুদ্ধের ফলে বর্তমানে তাদের সেই অব্যাহতি ব্যবস্থা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
আবার অনেক ইসরায়েলি রক্ষণশীল ইহুদিদের দীর্ঘদিনের এই অব্যাহতি ব্যবস্থায় অসন্তুষ্ট। তাদের মতে, বর্তমানে সেখানে সেনাবাহিনী চরম চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে অনেক নাগরিককে একাধিকবার সংরক্ষিত সেনাসদস্যের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এমন সময়ে রক্ষণশীল ইহুদিদের সামরিক সেবার দায়িত্ব থেকে ছাড় দেওয়া ন্যায়সঙ্গত নয় বলে দাবি তাদের।
এদিকে, এ বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন সরকারের মধ্যেও বিভাজন সৃষ্টি করেছে। রক্ষণশীল ইহুদিরা সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করেছে। ফলে চলতি বছরে নির্ধারিত সময়ের আগেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
একটি সংসদীয় কমিটির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১৩ হাজার রক্ষণশীল ইহুদি তরুণ ১৮ বছর বয়সে সামরিক নিয়োগের উপযুক্ত হন। তবে তাদের মধ্যে ১০ শতাংশেরও কম শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
অন্যদিকে, সেনাসদস্যের ঘাটতি মোকাবিলায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। বর্তমানে অধিকাংশ ইহুদি পুরুষকে প্রায় তিন বছর সামরিক সেবা দিতে হয়। এরপর তাদের দীর্ঘ সময় সংরক্ষিত সেনাসদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে হয়। ইহুদি নারীদের জন্য এই বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার মেয়াদ দুই বছর।
জেরুজালেমের এক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘আমরা রক্ষণশীল সম্প্রদায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমরা এই বিক্ষোভকে আমাদের অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছি। আমাদের দৃষ্টিতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া মানে ধর্ম ত্যাগ করা। আমরা আমাদের ইহুদি ধর্ম ছাড়তে চাই না। তাই আমাদের কাছে এটি নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই।’
তিনি আরও বলেন, ‘হাজার হাজার রক্ষণশীল ইহুদিকে জোর করে সেনাবাহিনীতে নেওয়ার কোনো উপায় নেই।’
বিক্ষোভকারীদের প্ল্যাকার্ড বহন করতে দেখা যায়, যাতে লেখা ছিল, ‘জায়নিস্ট হিসেবে বেঁচে থাকার চেয়ে আমরা ইহুদি হিসেবে মরতে রাজি’ এবং ‘জায়নিস্ট ধর্মের স্বার্থে পরিচালিত সেনাবাহিনীতে আমরা সেবা দিতে অস্বীকৃতি জানাই।’
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৩ শতাংশই রক্ষণশীল সম্প্রদায়ের সদস্য। একইসঙ্গে এই সম্প্রদায়ে সেখানে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল জনগোষ্ঠী। ঐতিহ্যগতভাবে তারা পূর্ণকালীন ধর্মীয় শিক্ষায় নিয়োজিত ছিলেন। তাই দীর্ঘদিন ধরে এই সম্প্রদায়ের লোকেরা সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি পেয়ে আসছেন।
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় এই ব্যবস্থার সূচনা হয়। সে সময় গণহত্যায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া ইহুদি শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতে রক্ষণশীল শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় অধ্যয়নে নিয়োজিত করা হয়েছিল।
তবে রক্ষণশীল সম্প্রদায়ের সামরিক সেবা থেকে এই অব্যাহতি এবং ২৬ বছর বয়স পর্যন্ত ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সরকারি ভাতা দেওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই বহু ইসরায়েলির অসন্তোষের কারণ হয়ে আছে।
এদিকে, ইসরায়েলকে বর্তমানে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় একযোগে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে হচ্ছে। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গেও সংঘাতে জড়িত পড়েছে তারা। ফলে তাদের সেনাবাহিনী জনবল সংকট ও তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে।
২০১৭ সালে ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট রক্ষণশীলদের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি ব্যবস্থাকে অবৈধ ঘোষণা করে। তবে আদেশ বাস্তবায়নে সরকারের গড়িমসির কারণে এই অব্যাহতি ব্যবস্থা এখনও কার্যকর রয়েছে।
ইসরায়েলের ইহুদি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর কাছে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা জাতীয় ঐক্য এবং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে অপেক্ষাকৃত বিচ্ছিন্ন রক্ষণশীল সম্প্রদায়ের অনেকেই আশঙ্কা করেন, সেনাবাহিনীতে যোগ দিলে তরুণরা ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতির সংস্পর্শে চলে যাবে।
৭ ঘণ্টা আগে