এলডিসি গ্রুপ
এলডিসির চ্যালেঞ্জ আন্তর্জাতিক সংহতি ও বহুপাক্ষিকতার বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা
স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ আন্তর্জাতিক সংহতি এবং বহুপাক্ষিকতার (মাল্টিলেটারালিজম) বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য একটি পরীক্ষা বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
সোমবার (১৩ জুলাই) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের হলরুমে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) গ্রুপের পক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
এ সময় জরুরি পদক্ষেপের জন্য পাঁচ দফা অগ্রাধিকার উপস্থাপন করে তিনি বলেন, ‘এলডিসি গ্রুপ সব অংশীদারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছে, যাতে মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে (টার্নিং পয়েন্টে) পরিণত হয়। এর ফলে উন্নয়নে নতুন গতি সঞ্চার হবে, আস্থা পুনর্গঠন ও কাউকে পেছনে না রেখে টেকসই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে।’
এলডিসি গ্রুপ টেকসই উন্নয়নের জন্য ২০৩০ এজেন্ডা এবং দোহা কর্মসূচির (দোহা প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন-ডিপিওএ) প্রতি তাদের অবিচল অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। এই দুটি কাঠামো এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর টেকসই, সহনশীল উন্নয়ন এবং সুষ্ঠু উত্তরণের পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করছে।
অধ্যাপক তিতুমীর বলেন, আমরা যখন ২০৩০ সালের চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছি, তখন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অগ্রগতি উদ্বেগজনকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ।’
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত দুর্বলতা, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, ঋণের বোঝা বৃদ্ধি, সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা, সরকারি উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) হ্রাস, ডিজিটাল বৈষম্য বৃদ্ধি এবং সাশ্রয়ী অর্থায়নে সীমিত সুযোগ—এসব বিষয় আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে অব্যাহতভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।’
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, এসব চ্যালেঞ্জ শুধু ২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়নকেই বাধাগ্রস্ত করছে না, বরং ২০৩১ সালের মধ্যে আরও বেশিসংখ্যক স্বল্পোন্নত দেশকে টেকসই ও অপরিবর্তনীয়ভাবে উত্তরণের লক্ষ্যসহ দোহা কর্মসূচির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
বর্তমানে ১৪টি স্বল্পোন্নত দেশ বিভিন্ন পর্যায়ে উত্তরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে এবং তাদের এখনও ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
অভূতপূর্ব রাজনৈতিক, সামষ্টিক অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও বৈশ্বিক অভিঘাতের কারণে বাংলাদেশ ও নেপাল তাদের প্রস্তুতিকাল ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তিন বছর বাড়ানোর আবেদন করেছে।
অধ্যাপক তিতুমীর বলেন, জটিল দেশীয় ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মধ্য দিয়ে উত্তরণের পথে থাকা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, সুষ্ঠু উত্তরণ কৌশল (স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি-এসটিএস) বাস্তবায়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার জোরদারের জন্য কৌশলগত কারণে এই অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন।
এ প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, এসব দেশের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা, সহনশীলতা বৃদ্ধি, উৎপাদন সক্ষমতার উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে দোহা কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত অপরিহার্য।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ‘আগামী বছর দোহায় অনুষ্ঠিতব্য দোহা কর্মসূচির (ডিপিওএ) মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনা বৈশ্বিক অংশীদারত্ব জোরদার এবং গৃহীত অঙ্গীকার বাস্তবায়নের গতি ত্বরান্বিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।’
তিনি বলেন, মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনা যাতে রূপান্তরমূলক এবং বাস্তবায়নযোগ্য ফলাফল বয়ে আনে তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রী এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন অংশীদারদের শীর্ষ পর্যায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে এলডিসি গ্রুপ।
জরুরি পদক্ষেপের জন্য পাঁচ দফা অগ্রাধিকার
এ সময় জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য এলডিসি গ্রুপের পক্ষ থেকে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর পাঁচটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন।
প্রথমত, ক্রমবর্ধমান ঋণঝুঁকি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত, পূর্বানুমানযোগ্য ও স্বল্পসুদে ঋণসহ অনুকূল অর্থায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উৎপাদন সক্ষমতা, সহনশীল অবকাঠামো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মৌলিক সেবায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতা বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার করতে হবে। এ জন্য অনুকূল অর্থায়নে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, ঋণ পরিশোধে স্থগিতাদেশ, টেকসই ঋণ সমাধান এবং আরও ন্যায্য অর্থায়ন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, জলবায়ু অর্থায়ন হতে হবে সহজলভ্য, পূর্বানুমানযোগ্য এবং দেশগুলোর ঝুঁকির মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘অভিযোজন, সহনশীলতা বৃদ্ধি, জ্বালানি রূপান্তর এবং “লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড”-এর জন্য প্রদত্ত সহায়তা অতিরিক্ত, পর্যাপ্ত এবং সহজলভ্য হতে হবে। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও সহনশীল অবকাঠামোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোও জরুরি।’
চতুর্থত, সুরক্ষাবাদী প্রবণতা থেকে সরে এসে এবং স্বচ্ছ, সহজ ও উন্নয়নবান্ধব নীতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য বাজারে প্রবেশাধিকার সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ করতে হবে।
পঞ্চমত, প্রযুক্তি হস্তান্তর, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে ডিজিটাল ও প্রযুক্তিগত বৈষম্য দূর করতে আরও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন, যাতে স্বল্পোন্নত দেশগুলো উদ্ভাবনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে টেকসই উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে পারে।
১৫ ঘণ্টা আগে