উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র
ইউক্রেনে হামলায় উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে মস্কো, অভিযোগ জেলেনস্কির
ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও গ্লাইড বোমা দিয়ে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এতে অন্তত ৯ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে মঙ্গলবার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
একই সময়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মস্কোর বিরুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেছেন, চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধে মস্কো উত্তর কোরিয়া থেকে নতুন করে সামরিক সহায়তা পাচ্ছে।
জেলেনস্কি বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া শহরে রাতভর হামলায় রুশ বাহিনী উত্তর কোরিয়ার সরবরাহ করা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই হামলায় ছয়জন নিহত ও ১৯ জন আহত হয়েছেন।
এছাড়া মধ্যাঞ্চলীয় দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে রাশিয়ার ড্রোন ও গোলাবর্ষণে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরসহ আরও তিনজন নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
স্থানীয় সময় সোমবার (১০ আগস্ট) রাতে জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া পিয়ংইয়ংয়ের কাছ থেকে আরও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পেয়েছে এবং আরও উত্তর কোরীয় সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
দুই বছরের বেশি সময় আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তিতে সই করেন। চুক্তিতে দুই দেশের যেকোনো একটি দেশ আগ্রাসনের শিকার হলে পারস্পরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
ইউক্রেনে পুতিনের আগ্রাসনকে সমর্থন করতে কিম হাজার হাজার সেনা এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সরবরাহ করেছেন। বিশেষজ্ঞের কারও কারও মতে, মস্কোর সঙ্গে এই সহযোগিতার ফলে উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা বাড়ছে। জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা উত্তর কোরিয়াকে এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে উঠতে সহায়তা করবে।
ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বাড়াচ্ছে। কিয়েভের কাছে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে সক্ষম প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতিকে কাজে লাগাতেই মস্কো এ উদ্যোগ নিয়েছে বলে দাবি ইউক্রেনের। দেশটি আরও বলছে, পূর্ব ও দক্ষিণ ইউক্রেনজুড়ে ১ হাজার ২৫০ কিলোমিটার (৭৭৫ মাইল) দীর্ঘ সম্মুখসারিতে নতুন করে অভিযান চালাতে রাশিয়া সেনা নিয়োগ বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেলেনস্কি বলেন, ‘ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বাড়ানো, উত্তর কোরিয়ার সরঞ্জাম আনা, সেনা সমাবেশের প্রস্তুতির মতো রাশিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপই দেখাচ্ছে যে মস্কো শান্তির জন্য নয়, বরং উত্তেজনা বাড়ানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।’
যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। সমঝোতার দিকে অগ্রগতির অভাবে ওয়াশিংটন হতাশ হয়ে পড়েছে এবং ইরান যুদ্ধের দিকে তাদের মনোযোগ সরে গেছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার সোমবার রাতে এক বিশ্লেষণে বলেছে, ‘পুতিন যতক্ষণ মনে করবেন যে তার পূর্ণাঙ্গ লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি কার্যকর সামরিক পথ রয়েছে, ততক্ষণ ক্রেমলিন গুরুতর আলোচনায় প্রবেশ করবে না বা তার দাবিতে বড় কোনো ছাড় দেবে না।’
সংস্থাটি আরও বলেছে, ইউক্রেনের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি রাশিয়াকে ইউক্রেনের ব্যাপক ক্ষতি করার সুযোগ করে দিচ্ছে। এর ফলে অর্থবহ আলোচনা পিছিয়ে যেতে এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে।
কিয়েভের শিশু হাসপাতালে হামলা
রাতভর ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের বিভিন্ন এলাকাতেও হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। একটি হামলায় একটি শিশু হাসপাতালের চত্বরে দুটি গর্ত তৈরি হয় এবং জানালার কাচ ভেঙে যায় বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় জরুরি সেবা বিভাগ। তবে শিশু ও চিকিৎসাকর্মীরা বোমা আশ্রয়কেন্দ্রে থাকায় কেউ আহত হয়নি।
রাজধানীর অন্য একটি এলাকায় রুশ হামলায় একটি গুদামে আগুন ধরে যায়। জরুরি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগুন প্রায় ১ হাজার ২০০ বর্গমিটার (প্রায় ১৩ হাজার বর্গফুট) এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের বাহিনী রাতভর কিয়েভ ও জাপোরিঝঝিয়ার ‘সামরিক শিল্প স্থাপনা এবং পরিবহন ও সরবরাহ কেন্দ্রগুলোতে’ স্থলভিত্তিক নির্ভুল অস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে।
আজ (মঙ্গলবার) এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয়টি জানায়, কিয়েভে ড্রোন সংরক্ষণ করা হচ্ছিল এমন বেসামরিক গুদাম এবং জাপোরিঝঝিয়া শহরের একটি ধাতু কারখানায় হামলা চালানো হয়েছে।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়া জাপোরিঝঝিয়া ও কিয়েভে জিরকন অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র ও ইস্কান্দার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন ধরনের ১২০টি দূরপাল্লার হামলা চালানোর ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
রাশিয়ার বৃহত্তম ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে আবারও হামলা
অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাতভর তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাশিয়ার ১৪টি অঞ্চল ও অধিকৃত ক্রিমিয়ার আকাশে প্রায় ৪০০টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
রাশিয়ার বৃহত্তম অনলাইন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়াইল্ডবেরিজ জানিয়েছে, ইউক্রেন সীমান্তবর্তী ভোরোনেজ অঞ্চলে তাদের সরবরাহকেন্দ্রগুলো হামলার শিকার হয়ে আগুন ধরে যায়। তবে পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, সেখানে সংরক্ষিত পণ্য ‘বেশিরভাগই অক্ষত’ রয়েছে।
ইউক্রেন এর আগে একাধিকবার ওয়াইল্ডবেরিজের গুদামে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার তেল স্থাপনাগুলোতেও হামলা চালিয়ে আসছে দেশটি। কিয়েভের দাবি, পুতিনকে যুদ্ধ অবসানে আলোচনায় বসতে বাধ্য করার কৌশলের অংশ হিসেবে এসব হামলা চালানো হচ্ছে।
ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফ জানিয়েছে, রাতভর তাদের বাহিনী রাশিয়ার ওরেনবুর্গ অঞ্চলের ওরস্কনেফতেওরগসিনতেজ তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শোধনাগারটিতে হামলার পর আগুন ধরে যায়।
শোধনাগারটির বছরে প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে। সেখানে গ্যাসোলিন, ডিজেল ও উড়োজাহাজের জ্বালানিসহ বিভিন্ন ধরনের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য উৎপাদন করা হয়। হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী।
১ দিন আগে