পারমাণবিক বোমার জ্বালানি উৎপাদনের একটি নতুন কারখানা উন্মোচন করেছে উত্তর কোরিয়া। দেশটির নেতা কিম জং উন তার দেশের পারমাণবিক শক্তি ‘জ্যামিতিক হারে’ বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (৪ মে) কারখানাটি উন্মোচন করা হয়।
যদিও কিছু বিশেষজ্ঞ এখনও প্রশ্ন তুলছেন যে উত্তর কোরিয়ার কাছে সত্যিই কার্যকর পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র আছে কিনা যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম, তবে এই পারমাণবিক কারখানার প্রকাশ ইঙ্গিত দেয় যে কিম তার দেশকে একটি পারমাণবিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সেই সঙ্গে তিনি তার পারমাণবিক কার্যক্রমকে আলোচনার টেবিলে তুলে দেওয়ার কোনো ইচ্ছা রাখেন না।
দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (কেসিএনএ) জানায়, গতকাল (বুধবার) স্থানটি পরিদর্শনের পর কিম বলেন, তিনি এবং শীর্ষ কর্মকর্তারা ‘রাষ্ট্রের পারমাণবিক শক্তি জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছেন।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকেন্দ্র হতে পারে কারখানাটি
কেসিএনএ জানিয়েছে, কারখানাটিতে আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তবে এর অবস্থানসহ বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ এই স্থানটিকে একটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করে জানিয়েছে, তারা উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করছে।
কেসিএনএ প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায়, কিম রূপালি রঙের নলের সারিতে ভরা সংকীর্ণ পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, যেটিকে একটি সেন্ট্রিফিউজ কক্ষ বলে মনে হচ্ছে। আরেকটি ছবিতে তাকে একটি সভাকক্ষে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়, যেখানে টেবিলে একটি শঙ্কু আকৃতির বস্তুর ঝাপসা ছবিসহ নকশা ছড়ানো রয়েছে। তবে ওই নকশাটি কোনো ওয়ারহেডের নকশা কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের কথা প্রকাশ করল উত্তর কোরিয়া। ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়া আরেকটি গোপন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের ছবি প্রকাশ করেছিল। ২০১০ সালে দেশটির প্রধান পারমাণবিক কমপ্লেক্স ইয়ংবিওনে আমেরিকান গবেষকদের সামনে একটি কেন্দ্র প্রদর্শন করা হয়েছিল।
গত সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়ার একীকরণ মন্ত্রী চুং ডং-ইয়ং আইনপ্রণেতাদের জানান, উত্তর কোরিয়া ইয়ংবিওন কমপ্লেক্সসহ মোট চারটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র পরিচালনা করছে এবং প্রতিদিনই সেখানে কার্যক্রম চলছে।
পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের স্বীকৃতির দাবি
কারখানা পরিদর্শনকালে কিম বলেন, ‘সবচেয়ে হিংস্র শত্রু যারা (যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া), তাদের মোকাবিলায় গুণগত ও পরিমাণগতভাবে দেশের পারমাণবিক প্রতিরোধ শক্তি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।
কিম বলেন, পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ তার দেশের ‘অপরিবর্তনীয়’ অবস্থান। তিনি দাবি করেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক উপকরণ উৎপাদন সক্ষমতা পাঁচ বছর আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। তবে এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কিম আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের স্বীকৃতি চান, যাতে তিনি জাতিসংঘের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি করতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিম শেষ পর্যন্ত আংশিক পারমাণবিক সক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ছাড় আদায়ের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় জোর দেবেন।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বারবার কিমের সঙ্গে পুনরায় কূটনীতি সম্পর্ক শুরু করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে উত্তর কোরিয়ার নেতা জানিয়েছেন, আলোচনার পূর্বশর্ত হিসেবে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের দাবি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে আগে সরে আসতে হবে।
উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন
২০১৯ সালে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রথম দফা ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে কিম ব্যাপক অস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং বারবার অস্ত্রভান্ডার ‘জ্যামিতিক হারে’ বিস্তারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এর ফলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, উত্তর কোরিয়ার কাছে এখন সম্ভবত এমন পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে যা মার্কিন মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম। তবে কিছু বিশেষজ্ঞ এখনও বলছেন, উত্তর কোরিয়া সর্বশেষ প্রযুক্তিগত বাধাগুলো অতিক্রম করেছে কি না তা প্রমাণিত হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশের সময় ওয়ারহেড অক্ষত রাখা এবং মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে একটি ক্ষেপণাস্ত্রে একাধিক পারমাণবিক ওয়ারহেড স্থাপনের প্রযুক্তি।
২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছিলেন, উত্তর কোরিয়া ২০ থেকে ৬০টি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে কিছু বিশেষজ্ঞ এখন মনে করেন, দেশটির অস্ত্রভান্ডারে শতাধিক ওয়ারহেড রয়েছে।
২০২৩ সালে উত্তর কোরিয়া এক ধরনের ব্যাটেলফিল্ড পারমাণবিক ওয়ারহেড উন্মোচন করে। সে সময় বিশ্লেষকদের কেউ কেউ অনুমান করেছিলেন যে এটি নতুন পারমাণবিক পরীক্ষার আগাম ইঙ্গিত হতে পারে। তবে তা নিয়ে উত্তর কোরিয়া এখন পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা চালায়নি।