যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একটি ট্যাঙ্কার অচল করার পাশাপাশি ইরানের কেশম দ্বীপে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরানও কুয়েত ও বাহরাইনের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এতে দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে চলমান প্রচেষ্টা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২ জুন) মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালি থেকে ইরানে প্রবেশের সময় একটি টাঙ্কারকে লক্ষ্য করে হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, জাহাজটি তাদের আরোপিত অবরোধ অমান্য করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। পরে মার্কিন বাহিনী আরও জানায়, তারা ইরানের পাল্টা হামলা প্রতিহত করতে ইরানের কেশম দ্বীপের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায়ও হামলা চালিয়েছে।
এর জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করে, কেশমে হামলার জবাবে তারা বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের এ দাবি অস্বীকার করেছে।
সেন্টকম জানায়, মঙ্গলবার দুই দেশের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়। বতসোয়ানার পতাকাবাহী খালি ট্যাঙ্কারবাহী এমটি লেক্সি জাহাজটি আন্তর্জাতিক জলসীমা দিয়ে ইরানের খার্গ দ্বীপের দিকে যাচ্ছিল। যাওয়ার সময় জাহাজটি ২৪ ঘণ্টা ধরে দেওয়া একাধিক সতর্কবার্তা উপেক্ষা করছিল। এরপর একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে জাহাজটির ইঞ্জিন অচল করে দেওয়া হয়। খার্গ দ্বীপটি হরমুজ প্রণালির উত্তরে কুয়েতের কাছাকাছি অবস্থিত।
এ ঘটনার কিছুক্ষণ পর কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে পেরেছে। একইসঙ্গে কুয়েত তাদের জনগণকে হামলা প্রতিহত করার সময় পড়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ, ধারালো বা অজ্ঞাত কোনো বস্তুর কাছে না যেতে সতর্ক করে দেয়। প্রায় একই সময়ে বাহরাইনেও সতর্কতামূলক সাইরেন বাজতে শোনা যায়।
সেন্টকম জানায়, কুয়েতের দিকে ছোড়া ইরানের দুটি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও বাহরাইনের যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাহরাইনের দিকে লক্ষ্য করে ছোড়া তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করে।
পরে সেন্টকম জানায়, কুয়েতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালায় ইরান। সেটিও প্রতিহত করা হয়েছে। এতে কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি।
মার্কিন বাহিনী আরও জানায়, তারা তিনটি একমুখী হামলাকারী ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তাদের দাবি, ড্রোনগুলো ইরান থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। আঞ্চলিক জলসীমায় বৈধভাবে চলাচলরত বেসামরিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোনগুলো ছোড়া হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
এদিকে, মার্কিন বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের কেশম দ্বীপে অবস্থিত একটি সামরিক গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনেও হামলা চালিয়েছে।
সাম্প্রতিক এই পাল্টাপাল্টি হামলা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নিরসনে কূটনৈতিক অগ্রগতির স্থবিরতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর প্রথমবারের মতো সিনেট ফরেন রিলেশনস কমিটিতে উপস্থিত হয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
মঙ্গলবার রুবিও দাবি করেন, তেহরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা এখন নাগালের মধ্যে রয়েছে। তিনি জানান, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির এমন কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনায় সম্মত হয়েছে, যেগুলো নিয়ে এক মাস আগেও তারা আলোচনা করতে রাজি ছিল না।
তবে রুবিওর এই মন্তব্য ইরানের সাম্প্রতিক অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা স্থগিত করবে। এতে দুই দেশের মধ্যে চলমান আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ‘ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি সব ফ্রন্টেই কার্যকর, যার মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত। একটি ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন মানে সব ফ্রন্টেই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করা। এর যেকোনো পরিণতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দায়ী থাকবে।’
অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় নতুন সমঝোতা হওয়ার পরও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। অথচ, ওই সমঝোতার উদ্দেশ্য ছিল লেবাননে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে আরও শক্তিশালী করা।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সোমবার জানান, তিনি বৈরুতে ইসরায়েলের একটি সম্ভাব্য হামলা ঠেকিয়েছেন। তিনি বলেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং হিজবুল্লাহর প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। গোলাগুলি বন্ধ করতে তারা সবাই সম্মত হয়েছে।
তবে এর পরদিনই লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, দেশেটির দক্ষিণাঞ্চলে অন্তত ৩০টি ইসরায়েলি হামলা চালানো হয়েছে।
লেবাননের সাইদা শহরের কাছে একটি ইসরায়েলি হামলার পর উদ্ধারকারীরা একই পরিবারের ছয় সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করেছেন। নিহতদের মধ্যে দুই শিশু ও এক নারী ছিলেন।
এদিকে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নাবাতিয়েহর বাসিন্দাদের নতুন করে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিল। এরপর ওই এলাকায় তারা হামলা চালিয়েছিল। তাদের দাবি, হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
গত ১৩ এপ্রিল থেকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ কার্যকর হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কয়েকটি জাহাজ অচল করেছে। তার মধ্যে এমটি লেক্সি হলো ষষ্ঠ জাহাজ।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, এ পর্যন্ত তারা ১২২টি জাহাজকে ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশ বাতিল করতে সক্ষম হয়েছে।
এর আগে, গত সপ্তাহের শেষে মার্কিন বাহিনী ইরানের রাডার ও ড্রোন স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান কুয়েতে অবস্থিত একটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়।