বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ এবং এ অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের প্রতি দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, পাচার হওয়া অর্থের মাত্র এক-নবমাংশ উদ্ধার করা গেলেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব।
সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ আহ্বান জানান।
শফিকুর রহমান বলেন, গত ১৫ বছরে অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি অংশ দেশ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার করেছে। কিন্তু সেই অর্থ কীভাবে ফেরত আনা হবে, সে বিষয়ে বাজেটে কোনো দিকনির্দেশনা নেই।
তিনি বলেন, ‘বাজেট ঘাটতি খুব বেশি নয়। পাচারকৃত অর্থের নয় ভাগের এক ভাগও যদি আগামী অর্থবছরে ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলে আমাদের কোনো বাজেট–ঘাটতি থাকবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সম্পদের সঙ্গে কালপ্রিটদেরও (অপরাধী) ফিরিয়ে আনতে হবে। সম্পদ এল, আর কালপ্রিটরা থেকে গেল, তাহলে সঠিক শিক্ষা হবে না।’ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করে দ্রুততম সময়ে অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জামায়াতের আমীর বলেন, সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল, সবার চিন্তাধারা এক হওয়া সম্ভব নয়। সবার চিন্তা একই রকম হলে এত লোকের বক্তৃতা বা এত সময় খরচের প্রয়োজন হতো না, দুই পক্ষ থেকে একজন করে কথা বললেই চলত। আমরা জনগণের ভালোবাসা এবং ভোটে নির্বাচিত হয়ে মহান আল্লাহর ইচ্ছায় এই সংসদে আসার সুযোগ পেয়েছি। তাই প্রত্যেকেই নিজের বিবেক, মহান আল্লাহ এবং প্রিয় জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।
বাজেট অধিবেশনকে বছরের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সেশন আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এর ভিত্তির ওপরই পুরো বছরটি কেমন যাবে তা নির্ভরশীল এবং সব সদস্য সেই দায়িত্ববোধ থেকেই বক্তব্য দিয়েছেন।
এ সময় তিনি প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, মুক্তিযুদ্ধের সফল নেতৃত্বদানকারী জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী এবং স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী আ স ম আবদুর রবের অবদানের কথা স্মরণ করেন। একই সঙ্গে তিনি ৯০-এর গণআন্দোলন, ২৮ অক্টোবর, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বর এবং সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শহিদ ও জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।
নিজের দলকে একটি ‘কষ্টে ভোগা দল’ হিসেবে বর্ণনা করে শফিকুর রহমান বলেন, তাদের বুক থেকে এক এক করে ১১ জন জ্যেষ্ঠ নেতাকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং ১২ নম্বর জন হিসেবে কেবল তিনিই এখন জীবিত আছেন। ড. শফিকুর রহমান ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সব শহিদ, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী এবং ফ্যাসিবাদী আমলের ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানান।
পিলখানায় বীর সেনাদের নির্মম হত্যাকাণ্ডকে জাতির সূর্য-বীর্যের জায়গায় আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে তিনি তাদের শাহাদত কবুলের জন্য দোয়া করেন। সীমাহীন ত্যাগের মধ্য দিয়ে গঠিত এই সংসদকে ‘মজলুমের পার্লামেন্ট’ আখ্যা দিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংসদ এমন কোনও আচরণ করবে না যা মজলুম দেশবাসীকে আঘাত করে, বরং এটি জাতিকে স্বপ্ন দেখাবে, ঐক্যবদ্ধ করবে এবং সামনের দিকে এগিয়ে নেবে।
তোষামোদের নয়, দায়িত্ব পালনের জায়গা
স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদের উদ্দেশে শফিকুর রহমান বলেন, ‘অতীত অভিজ্ঞতা আপনার আছে; আমার নেই। এখানে আরও কয়েকজন আছেন যারা অতীতেও ছিলেন। আমরা বেশিরভাগই নবীন, আর নবীনদের অধিকার থাকে প্রবীণদের কাছ থেকে শেখার। কিন্তু আমরা মন্দটা শিখতে চাই না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা শিখতে চাই ভালোটা। অতীতে এই সংসদে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিকে তোষামোদ করার জন্য গান হয়েছে, কবিতা হয়েছে, স্বপ্নবিলাস হয়েছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ করে এই সংসদে এটা হওয়া উচিত নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটা তোষামোদের জায়গা নয়, এটা দায়িত্ব পালনের জায়গা। দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার জায়গা। দায়িত্ব পালন করা জায়গা। অনেক সময় ব্যক্তিকে খুশি করতে গিয়ে অন্যকে আমরা বেশি করে আঘাত করি। আমি প্রথম দিন অনুরোধ করেছিলাম, অতীতের ব্যাড কালচারকে (খারাপ সংস্কৃতি) আমরা চর্চা না করি; এই সংসদে দাঁড়িয়ে চরিত্র হনন যেন না হয়।’
বিরোধী দলের বক্তব্য ‘কুচি কুচি করে কাটার যন্ত্র’ ফেলে দেওয়ার আহ্বান
সংসদে বিরোধী দলের ওপর বারবার আক্রমণের সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘একটা চমৎকার টেনডেন্সি (প্রবণতা) আমি লক্ষ করেছি—সরকারি দলের প্রায় সব বক্তা বিরোধী দলের বক্তব্য কুচি কুচি করে কাটার পরে বলেন, এগুলো ছাড়েন। আসুন ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা দেশটা চালাই। ওই কুচি কুচি করার যন্ত্রটা আসুন আমরা ফেলে দিই। আমরা একটা বিউটিফুল, ওয়ানডারফুল কম্বিনেশন নিয়ে চলি।’