সংগঠনের আদর্শবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সারা দেশে প্রায় ৩০০ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেছে জাতীয়তাবাদী যুবদল। সংগঠনটির সুনাম ও শৃঙ্খলা রক্ষায় অনেকের বিরুদ্ধে থানায় ফৌজদারি মামলাও করা হয়েছে।
বুধবার (৮ জুলাই) রাজধানীর নয়া পল্টনের হোটেল ভিক্টোরির সাঙ্গু ব্যাঙ্কুয়েট হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না।
তিনি বলেন, আলোচিত কিছু ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। আবার অধিকতর তদন্তের পর কয়েকজনের বিরুদ্ধে নেওয়া সাংগঠনিক শাস্তি প্রত্যাহারও করা হয়েছে।
যুবদল সভাপতি বলেন, বর্তমান কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে যুবদলের নেতাকর্মীরা গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দাবিতে পরিচালিত আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে জনমত গঠন, মিছিল, সমাবেশ, গণসংযোগ এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এসব আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে কয়েক শতাধিক নেতাকর্মী গুম, খুন ও পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছেন এবং হাজার হাজার নেতাকর্মী গ্রেপ্তার, মামলা ও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন, যার ক্ষত অনেকেই এখনও বহন করছেন।
তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে দেশব্যাপী যুবদলের ৮২টি সাংগঠনিক ইউনিটের নেতাকর্মীরা জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন সফল করেছেন। আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত করতে যুবদলের ৭৮ জন নেতাকর্মী শহিদ হয়েছেন। শত শত নেতাকর্মী পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন এবং হাজার হাজার নেতাকর্মী রক্তাক্ত হয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জাতীয়তাবাদী যুবদল সবসময় সুশৃঙ্খল ও আদর্শিক রাজনৈতিক চর্চায় বিশ্বাসী এবং কোনো ধরনের বেআইনি, অনৈতিক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেয় না। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সংগঠনের নাম ব্যবহার করে বেআইনি কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ পাবে না। ভবিষ্যতে যাতে কেউ সংগঠনের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে না পারে, সেজন্য কঠোর নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
এ সময় বিগত সময়ে যুবদলের বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডের তথ্য তুলে ধরেন সংগঠনটির সভাপতি।
তিনি জানান, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শহিদ ৭৮ পরিবারের মধ্যে আর্থিক সহায়তা ও সম্মাননা প্রদান, আন্দোলনে নিহত নেতাকর্মীদের পরিবারের জন্য এফডিআর ও নগদ সহায়তা, নদী-খাল পরিচ্ছন্নতা অভিযান, সেতু নির্মাণ, কৃষকদের ধান কেটে ঘরে পৌঁছে দেওয়া, অসহায় ও রোগাক্রান্ত নেতাকর্মীদের চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তা এবং গৃহহীন পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে সংগঠনটি শুধু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেই নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক সহায়তায়ও ভূমিকা রেখে আসছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার
গত ৪ জুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর যুবদল দেশব্যাপী সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করেছে বলে জানিয়েছে আবদুল মোনায়েম মুন্না।
তিনি বলেন, ‘এ সময়ে কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক জরুরি সভা, ঢাকা বিভাগীয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন কর্মসূচি পালন করা হয়।’
যুবদল সভাপতি বলেন, ‘সংগঠনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি অপপ্রচার ও পেশীশক্তিনির্ভর রাজনীতির বিরুদ্ধে “সাংগঠনিক সপ্তাহ” ঘোষণা করে। এর অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগর উত্তর, দক্ষিণ ও ঢাকা জেলা যুবদলের উদ্যোগে প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচিগুলোতে কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়ন অংশ নেন।
‘কেন্দ্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে দেশব্যাপী ১০ বিভাগে ৩১টি টিম গঠন করা হয়। পরে বিভাগীয় টিমগুলোর প্রতিবেদন পর্যালোচনায় ৫ ও ৬ জুলাই কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়।’
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ৪ জুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর ৮ জুন নয়াপল্টনের হোটেল ভিক্টোরিতে টানা ১২ ঘণ্টাব্যাপী মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ১১ জুন ঢাকা বিভাগের জেলা ও মহানগর যুবদলের সঙ্গে জরুরি সভা এবং ১২ জুন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
১৩ জুন নবনির্বাচিত নেতারা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন ও দোয়া-মোনাজাত করেন।
অপপ্রচার ও শিষ্টাচারবহির্ভূত রাজনীতির বিরুদ্ধে সাংগঠনিক সপ্তাহ ঘোষণা করা হয়। এর অংশ হিসেবে ১৭ জুন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের উদ্যোগে সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে নয়াপল্টন থেকে শাহবাগ পর্যন্ত প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। একই কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২০ জুন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের উদ্যোগে মহাখালী কাঁচাবাজার থেকে নাবিস্কো হয়ে সাতরাস্তা মোড় পর্যন্ত আরেকটি প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বর্তমান কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সংগঠনকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করার লক্ষ্যে কাজ করছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে সাংগঠনিক টিম গঠন করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা পাওয়া গেলে যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে একযোগে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে রক্তদান কর্মসূচি, অসহায় মানুষের মধ্যে ত্রাণ ও শীতবস্ত্র বিতরণ, বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং দুর্যোগকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়ন, সহ-সভাপতি রেজাউল কবীর পল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল হোসেন তারেক এবং সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জুয়েল।