রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে তিন শতাধিক বেসরকারি ও নাগরিক সংগঠনের জাতীয় জোট সিএসও অ্যালায়েন্স।
রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ দাবি জানায় সংগঠনটি। এতে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০০ থেকে ২৫০ জনের একটি দল ক্লিনিকের নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে টিকা, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও নগদ টাকা লুট করে। পরে ভারী যন্ত্র দিয়ে কেন্দ্রের ভবনগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। সিএসও অ্যালায়েন্স রাড্ডার কর্মী ও কেন্দ্রটির ওপর নির্ভরশীল সব পরিবারের পাশে থাকার কথা জানিয়েছে।
রাড্ডা মিরপুরভিত্তিক একটি এনজিও স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ১৯৭৪ সালে রাড্ডা বার্নেনের (সেভ দ্য চিলড্রেন সুইডেন) উদ্যোগে এর যাত্রা শুরু হয়। পাঁচ দশক ধরে সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বে প্রতিষ্ঠানটি দরিদ্র মা ও শিশুদের টিকা, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনের দ্বিতীয় দফা শুরুর ঠিক আগে মিরপুর-১-এর ক্লিনিকটিতে হামলা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ত্রিপলের অস্থায়ী তাঁবুতে শিশুদের টিকা দেওয়া চালিয়ে গেলেও বেশির ভাগ সেবা বন্ধ রাখতে হয়েছে।
সিএসও অ্যালায়েন্স বলেছে, দেশের মানুষ প্রত্যাশা করেছিল নবনির্বাচিত সরকার মব সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি থেকে আরও বেশি সুরক্ষা দেবে এবং কার্যকর বিচার নিশ্চিত করবে। কিন্তু এসব সমস্যা এখনও চলছে এবং রাড্ডায় হামলা সেই চলমান উদ্বেগের আরেকটি উদাহরণ। জমি নিয়ে বিরোধের মীমাংসা আইনি প্রক্রিয়ায় হতে হবে, মাঝরাতে শক্তি প্রয়োগ করে নয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সেবা প্রদানে সরকার, বেসরকারি খাত ও এনজিওর অংশীদারত্ব আইনশৃঙ্খলা বজায় থাকার ওপর নির্ভরশীল। স্বাস্থ্য খাতে এনজিওগুলো দীর্ঘদিন রাষ্ট্রের পাশে থেকে কাজ করছে।
স্বাধীনতার ৫০ বছরে নাগরিক সংগঠনের ভূমিকা নিয়ে সিএসও অ্যালায়েন্সের গবেষণার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, ১৯৮৫ সালে মাত্র ২ শতাংশে থাকা শিশুদের টিকাদান বাড়াতে এই অংশীদারত্ব ভূমিকা রেখেছে। সর্বশেষ ইপিআই কাভারেজ ইভ্যালুয়েশন সার্ভে-২০২৩ অনুযায়ী, দেশে পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত শিশুর হার এখন ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ। চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও দখলবাজি থেকে সবার আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করা হয়।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় এ পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার ও লুট হওয়া মালামাল উদ্ধার, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তদন্তের ঘোষণা এবং মালিকানার প্রশ্ন আদালতে নিষ্পত্তি ও টিকাদান চালু রাখার বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আশ্বাসকে স্বাগত জানিয়েছে সিএসও অ্যালায়েন্স।
সংগঠনটি সরকারের কাছে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে হামলার পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও অংশগ্রহণকারীদের শনাক্ত করতে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত এবং তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশের তদন্তের ফলাফল ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়েছে।
রাড্ডার ক্লিনিক যাতে নিরাপদে কাজ চালাতে পারে, সেই নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি টিকাদানসহ অন্যান্য সেবা ত্রিপলের তাঁবু থেকে একটি নিরাপদ অস্থায়ী কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে সহায়তা এবং লুট হওয়া টিকা ও সামগ্রী প্রতিস্থাপনের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। এতে ৩১ অক্টোবর শেষ হতে যাওয়া হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন থেকে এলাকার কোনো শিশু বাদ না পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
এছাড়া চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও দখলবাজি থেকে সব স্বাস্থ্যকেন্দ্র, এনজিও ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দেওয়া এবং যেকোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলাকে জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে গণ্য করার দাবি জানিয়েছে সিএসও অ্যালায়েন্স।
সিএসও অ্যালায়েন্স কার্যনির্বাহী কমিটির পক্ষে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন সহ-আহ্বায়ক ও ব্লাস্টের অনারারি নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন, সহ-আহ্বায়ক ও ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্, কোষাধ্যক্ষ ও কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের উপদেষ্টা শিব নারায়ণ কৈরী।
অ্যালায়েন্সের সদস্যদের মধ্যে স্বাক্ষর করেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, ওয়াটারএইডের আঞ্চলিক পরিচালক (দক্ষিণ এশিয়া) হাসিন জাহান, নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনালের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. এ কে এম মুসা ও ব্র্যাকের সিনিয়র ডিরেক্টর কে এ এম মোর্শেদ এবং সদস্যদের সমন্বয়ক ও আইআইডির নির্বাহী প্রধান সাঈদ আহমেদ।