বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলাকালে ভোট কারচুপি, জালভোট প্রদান, ফলাফলের শিটে আগাম সই নেওয়া এবং পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) হস্তক্ষেপও কামনা করেছে দলটি।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব অভিযোগ করেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, একটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এ উপনির্বাচনে গুরুতর অনিয়ম হচ্ছে। ভোট কারচুপি, জালভোট, এজেন্টদের বের করে দেওয়া এবং সকালেই রেজাল্ট শিটে স্বাক্ষর নেওয়ার মতো আপত্তিকর ঘটনা ঘটছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
এসব ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
পরওয়ার বলেন, শেরপুরের শ্রীবরদীতে তাদের প্রার্থী ইন্তেকাল করেছেন। নির্বাচনের আগে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, যা এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
শেরপুরে তাদের প্রার্থী সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান মাসুদ এবং বগুড়ায় প্রার্থী কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও বগুড়া শহরের আমির আবিদুর রহমান সোহেল।
তিনি বলেন, ৪, ৫ ও ৬ এপ্রিল আমরা কেন্দ্রের পক্ষ থেকে তিন দিন নির্বাচনি এলাকা সফর করেছি। সেখানে ভয়ভীতি প্রদর্শন, নেতা-কর্মীদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা এবং হুমকির আলামত পেয়েছি।
বগুড়ায় অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, কয়েকটি কেন্দ্রে প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা সকালেই পোলিং এজেন্টদের দিয়ে ফলাফলের শিটে জোরপূর্বক সই করিয়েছেন যা নির্বাচন বিধির পরিপন্থী। উদাহরণ হিসেবে তিনি মালতিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের কথা উল্লেখ করেন। তার দাবি, ওই কেন্দ্রে সকালে এজেন্টদের দিয়ে সই নেওয়ার পর জালভোট দেওয়া হয়েছে এবং পরে এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দুপুর ১২টা পর্যন্ত শেরপুরে অন্তত ১৩টি কেন্দ্রে জোর করে এজেন্টদের বের করে দিয়ে জাল ভোট দেওয়া হয়েছে। শ্রীবরদী পৌরসভার ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা কেন্দ্রে জাল ভোট প্রতিরোধ করতে গেলে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা কেন্দ্রে প্রবেশ করে তাদের এজেন্টদের বের করে দেন এবং জামায়াতের এক যুবনেতাকে মারধর করেন।
তার অভিযোগ, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে বারবার অনুরোধ করা হলেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকদের ‘পেটুয়া বাহিনী’ ভোটারদের, বিশেষ করে নারীদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দিচ্ছে এবং তাদের হয়রানি করছে।
উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের পর ক্ষমতায় আসা একটি বড় রাজনৈতিক দলের অধীনে প্রথম উপনির্বাচনেই যদি এমন চিত্র দেখা যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
এ সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, যেসব কেন্দ্রে অনিয়ম হয়েছে, সেসব কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করে পুনরায় ভোটের ব্যবস্থা এবং দায়ী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে জনগণ এমন একতরফা নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবে না বলে তিনি সতর্ক করেন।
তিনি আরও বলেন, প্রায় ৩০০ কেন্দ্রের মধ্যে যেসব কেন্দ্রে জালভোট ও এজেন্টদের বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর বিষয়ে দুপুর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য উদ্বেগজনক। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এসব ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
ভোটার ও এজেন্টদের নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দিচ্ছে, ফলে অনেক ভোটার ভোটকেন্দ্রে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। এ পরিস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম মা’ছুম, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি নাজিম উদ্দিন মোল্লা এবং প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি আতাউর রহমান সরকার উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে দুই আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন এই দুই আসনের তফসিল ঘোষণা করে।
এর আগে ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে উভয় আসনে নির্বাচিত হন। পরে তিনি বগুড়া-৬ আসন ছেড়ে দিয়ে ঢাকা-১৭ আসন রাখেন।
অন্যদিকে, জামায়াত প্রার্থী নূরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুর পর গত ৪ ফেব্রুয়ারি শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন বাতিল করেছিল নির্বাচন কমিশন।