রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে ডুবে যাওয়া বাসের যাত্রী খাইরুল ইসলাম খাঁ (২৬) বেঁচে ফিরেছেন। তিনি কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার আমবাড়িয়া ইউনিয়নের আমবাড়িয়া গ্রামের মৃত কুদ্দুস খাঁর ছেলে।
নিজের জীবন বাঁচাতে মাত্র ৫ সেকেন্ড সময় পেয়েছিলেন তিনি। বাসটি ডুবে যাওয়ার মুহুর্তে কীভাবে নদীর পানিতে ছিটকে পড়লেন, তা তিনি বলতে পারছেন না, তবে নদী সাঁতরে ডাঙায় ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এক উদ্ধারকারী তার হাতের মুঠোফোনটি ছিনিয়ে নেন। সেটি আর ফেরত পাননি তিনি।
মুঠোফোন খোয়া গেলেও বেঁচে ফিরতে পেরে শুকরিয়া আদায় করছেন খাইরুল। তার দাবি, বাসটি চালক নিজেই চালাচ্ছিলেন। এ ঘটনায় বাসচালক আরমান শেখের মরদেহ উদ্ধার হলেও ঘটনার সময় চালকের সহকারী ও সুপারভাইজার বাইরে থাকায় বেঁচে ফিরেছেন।
বুধবার দুপুর আড়াইটায় কুমারখালী থেকে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটি কয়েক মিনিট দেরিতে খোকসা বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে পৌঁছায়। সেখান থেকে দুজন যাত্রী বাসটিতে ওঠে বলে জানান কাউন্টার মাস্টার। দুপুর ২টা ৪২ মিনিটে বাসটি আবার যাত্রা শুরু করে।
খাইরুল ইসলাম জানান, তার আসন নম্বর ছিল বি-২। তার ঠিক পাশের ছিটে সাদা টি-শার্ট পরা যুবকটিও খোকসা স্ট্যান্ড থেকে আগেই বাসে উঠে বসেছিলেন। তাদের বাসটি ফেরিঘাটে পৌঁছানোর পর পাশের সিটের যুবক নেমে যান। কয়েক মিনিট পর আবার তিনি সিটে ফিরে আসেন। খাইরুল তাকে বসতে দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ান। এ সময় তাদের বাসটি ফেরিতে ওঠার চেষ্টা করছিল।
তিনি বলেন, ‘এ সময় হঠাৎ ঝাঁকুনি লাগে। আমি বাসের দরজা দিয়ে ছিটকে গিয়ে নদীর পানিতে পড়ি। এ সময় হাতেগোনা কয়েকজন বাসযাত্রী নদী সাঁতরে ফেরি ও পন্টুনে উঠে জীবন বাঁচিয়েছেন। তবে নদী সাঁতরে ডাঙায় ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এক উদ্ধারকারী আমার হাতের মুঠোফোনটি নিয়ে নেন। প্রথমে ভেবেছিলাম যে উনি আমাকে বাঁচানোর জন্য হাত বাড়িয়েছেন, কিন্তু তীরে ওঠার পর তাকে আর খুঁজে পাইনি।’
দুর্ঘটনার পর তার পাশের আসনের যুবকটির সঙ্গে আর দেখা হয়নি বলেও জানান তিনি।
খাইরুল আরও জানান, বাসের প্রতিটি আসনে যাত্রীতে ঠাঁসা ছিল। প্রায় প্রত্যেক নারী যাত্রীর সঙ্গে শিশু ছিল। আসনে বসে থাকা কমপক্ষে ৪০ জন নারী ও শিশু ডুবে যাওয়া বাসের মধ্যে আটকা পড়ে। বাসটি চালক নিজেই চালাচ্ছিলেন।
খাইরুল একটি টেক্সটাইল মিলের মেশিনম্যানের চাকরি করেন। ঈদের ছুটিতে তিনি বাড়ি গিয়েছিলেন। সেদিন তিনি কর্মস্থল ঢাকায় ফিরছিলেন।
সৌহাদ্য পরিবহনের খোকসার কাউন্টারের মাস্টার রাকিব বিশ্বাস জানান, বি-১ ও বি-২ আসনের যাত্রীরা খোকসা স্ট্যান্ডের কাউন্টারের যাত্রী ছিল। তাদের একজন জীবিত ফিরেছেন। অজ্ঞাত পরিচয়ের আর এক বৃদ্ধ যাত্রীও উঠেছিল। ওই বৃদ্ধ ও বি-১ আসনের যাত্রী রাজিবের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
রাকিব বিশ্বাসের দাবি, চালককে নিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। ঘটনার সময় তিনি চালকের আসনেই ছিলেন। বেঁচে ফেরা ফারুকের সঙ্গে তিনি কথা বলে তা নিশ্চিত হয়েছেন।
তিনি জানান, চালক আরমানের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। বাস ফেরিতে ওঠার আগে সুপারভাইজার সিরিয়ালের জন্য নেমেছিলেন আর হেলপার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদের বাড়িও রাজবাড়ী জেলায়। তবে কী কারণে এই দুর্ঘটনা, তা এখনেও নিশ্চিত হতে পারেননি বলে জানান এই কাউন্টার মাস্টার।
কুষ্টিয়া জেলা বাস মিনিবাস মালিক গ্রুপের সভাপতি আখতারুজ্জামান আখতার বলেন, সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি রাজবাড়ী জেলার মালিকাধীন। কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে বাসটি ছাড়ে। এর বেশি তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় যাত্রীবাহী বাস নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কুষ্টিয়ার শহরের মজমপুর এলাকার আবু বক্কর সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন (৫৬), খোকসা উপজেলার জানিপুর ইউনিয়নের খাগড়বাড়ীয়া গ্রামের হিমাংশু বিশ্বাসের ছেলে রাজীব বিশ্বাস (২৮), একই উপজেলার ধুশুন্দু গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ইস্রাফিল (৩) ও শমসপুর গ্রামের গিয়াসউদ্দিন রিপনের মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকার (১৩) মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে।