উন্নত জীবনের রঙিন স্বপ্ন নিয়ে ইউরোপ পাড়ি দিতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরের নীল জলেই নিভে গেছে সুনামগঞ্জের ১২টি তাজা প্রাণ। লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিস যাওয়ার পথে তীব্র খাদ্য ও পানীয় সংকটে অসুস্থ হয়ে অকালে প্রাণ হারিয়েছেন তারা।
আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই নৌযানে থাকা মোট ২২ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ১৮ জনই বাংলাদেশি আর নিহতদের ১২ জনই সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্যমতে, নিহতদের মধ্যে দিরাই উপজেলার ৬ জন, জগন্নাথপুরের ৫ জন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার ১ জন রয়েছেন।
নিহতরা হলেন— দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), সাজিদুর রহমান (২৮) ও শাহান মিয়া (২৫); রনারচর গ্রামের মুজিবুর রহমান (৩৮), বাসুরি গ্রামের মো. সুহানুর রহমান এবং মাটিয়াপুর গ্রামের তায়েফ মিয়া; জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান (৩৫), রানিগঞ্জ ইউনিয়নের ইছগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ আলী (২৭) ও টিয়ারগাঁও গ্রামের শায়েখ আহমদ (২২), চিলাউরা হলদিপুর ইউনিয়নের নাইম আহমদ (২৫), চিলাউরা মাঝপাড়া গ্রামের ইজাজুল হক সজীব (২৭) এবং দোয়ারাবাজার উপজেলা কবিরনগর গ্রামের আবু ফাহিম মুন্না (২২)।
এ সংবাদ পৌঁছানোর পর থেকে সংশ্লিষ্ট গ্রামগুলোতে শুরু হয়েছে শোকের মাতম। স্বজনদের গগনবিদারী আর্তনাদে পুরো এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
উদ্ধার হওয়া জীবিত যাত্রীদের বরাতে জানা গেছে, পাচারকারীরা একটি জরাজীর্ণ ও অত্যন্ত ছোট নৌকায় ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে তাদের সমুদ্রযাত্রায় পাঠায়। দীর্ঘ এ পথে তাদের জন্য রাখা হয়নি পর্যাপ্ত খাবার বা বিশুদ্ধ পানি। সাগরের মাঝখানে তীব্র গরমে তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত অবস্থায় যাত্রীরা একে একে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি এতটাই অসহনীয় হয়ে ওঠে যে, একের পর এক যাত্রী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, পাচারকারীদের নির্দেশে মরদেহগুলো সেই উত্তাল সাগরেই ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
নিহতদের পরিবারের অভিযোগ, দিরাই উপজেলার স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে জনপ্রতি ১২ লাখ টাকা চুক্তিতে লিবিয়া হয়ে গ্রিস যাওয়ার উদ্দেশ্যে তারা দেশ ছাড়েন। দালালরা তাদের নিরাপদ ও বড় জাহাজে করে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকূপ সমতুল্য একটি ছোট নৌকায় তুলে দেন। ১২ লাখ টাকা দিয়েও শেষ রক্ষা হলো না এ স্বপ্নচারী তরুণদের। শোকাতুর পরিবারগুলো এখন কেবল তাদের প্রিয়জনের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন।
স্বজনদের দাবি, সরকার যেন এ মর্মান্তিক ঘটনার দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িত মানবপাচারকারী চক্রকে আইনের আওতায় আনে। সম্ভব হলে নিহতদের মরদেহ বা অন্তত তাদের কোনো চিহ্ন উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো যুবক দালালের খপ্পরে পড়ে এভাবে প্রাণ না হারায়, সেদিকে কঠোর নজরদারি যেন বাড়ানো হয়।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কর্মসংস্থানের অভাব এবং উন্নত জীবনের হাতছানি এই যুবকদের মরণফাঁদে পা দিতে বাধ্য করছে। তবে অবৈধ পথে এভাবে বিদেশ যাত্রা রোধে জনসচেতনতা এবং পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
এদিকে, আজ (রবিবার) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম মানবপাচারের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার এবং এই অমানবিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
দ্রুত এ চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আইন ও বাংলাদেশের আইন—উভয় ব্যবস্থায় বিচার নিশ্চিত করার কথাও বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।