কৃষি
নওগাঁয় ধানের বাম্পার ফলনেও কৃষকের মুখে হাসি নেই
দেশের ধান উৎপাদনের অন্যতম শীর্ষ জেলা নওগাঁয় চলতি বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে ফলন ভালো হলেও বাজারের চিত্র ভিন্ন। গত বছরের তুলনায় ধানের দাম কম হওয়ায় উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা।
বিঘাপ্রতি বড় অঙ্কের লোকসানের আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এই অঞ্চলের হাজারো কৃষক। কৃষি বিভাগ অবশ্য আশা দিচ্ছে, মৌসুমের শুরু বলে দাম কিছুটা কম থাকলেও পুরোদমে ধান ওঠা শুরু হলে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১১টি উপজেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ১ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। এ মৌসুমে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২২ হাজার ৪৮০ টন, যা থেকে প্রায় ৮ লাখ ৮১ হাজার ৬৫৫ টন চাল পাওয়া যাবে।
খরচ ও আয়ের হিসাব মিলছে না
মাঠে ধান কাটার উৎসব শুরু হলেও বাজারে গিয়ে হতাশ হতে হচ্ছে কৃষকদের। গত মৌসুমে এই সময়ে প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে বাজারে দাম মিলছে মাত্র ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা।
রানীনগর উপজেলার বিজয়কান্দি গ্রামের প্রান্তিক চাষি আবুল কালাম আজাদ ও ভাটকই গ্রামের বিপথ চন্দ্র প্রামাণিক জানান, যারা অন্যের জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন, তাদের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। বিঘাপ্রতি ১৪ হাজার টাকা চুক্তিতে জমি লিজ নিয়ে জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, সার, কীটনাশক ও সেচসহ উৎপাদন খরচ পড়েছে ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এবার বিঘাপ্রতি গড়ে ২৫ মণ ধান উৎপাদন হয়েছে, কিন্তু বর্তমান বাজারমূল্যে তা বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা। ফলে বিঘা প্রতি অন্তত ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।
কৃষকদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় তারা ধান শুকাতে পারছেন না। এছাড়া পাওনাদারের চাপে অনেকটা বাধ্য হয়ে ধান বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে, যার সুযোগ নিচ্ছে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী।
তাদের দাবি, মন প্রতি দুই-তিনশ টাকা বেশি পাওয়া গেলেও তাদের অন্তত লোকসান গুনতে হতো না।
বাজারের চিত্র ও ব্যবসায়ীদের ভাষ্য
নওগাঁর বৃহত্তম ধানের মোকাম আবাদপুকুর, লোহাচুড়া হাট, আহসানগঞ্জ হাট, চকগৌরি হাট, মাতাজী হাট, সতী হাট, শিষা বাজার, শিবপুর বাজার, মহাদেবপুর হাটসহ বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা গেছে, ধানের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও ক্রেতা কম।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে আসা অধিকাংশ ধানই কাঁচা বা ভেজা। সেই সঙ্গে ধানের ক্রেতাও কম। অর্থাৎ, চাহিদার তুলনায় একদিকে যোগান বেশি, তার ওপর আবার ধানের মান তুলনামূলক নিম্ন। ফলে কৃষকরা গতবারের মতো দাম পাচ্ছেন না।
আবার অনেক ব্যবসায়ীর গুদামে গত বছরের ধান এখনও রয়ে গেছে। ফলে তারা মৌসুমের শুরুতেই ধান কেনায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
বড় ব্যবসায়ীদের ধান অবিক্রিত থাকার কারণ হিসেবে বিগত সরকারের অতিরিক্ত আমদানিকে দায়ী করেন নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার।
তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে ধান-চাল অবিক্রিত থাকায় বড় বড় ব্যবসায়ীরা নগদ টাকা বের করতে পারেননি। তারা নিজেরাই আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়েছেন। ব্যবসায়ীদের হাত টাকা না থাকলে তারা হাটে গিয়ে ধান কিনবেন কী দিয়ে? মূল ধারার ব্যবসায়ীরা ধান ক্রয় শুরু না করলে বাজারে দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনা খুবই কম।
এই ব্যবসায়ী নেতা আরও বলেন, তাছাড়া সরকারি খাদ্য গুদামগুলো যদি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা শুরু করে, তাহলেও বাজারে দাম কিছুটা বাড়বে। সরকার-নির্ধারিত ৩৬ টাকা কেজি দরে ধান বিক্রি করতে পারলে সব শ্রেণির কৃষকই লাভবান হবেন। অন্যথায়, জেলাজুড়ে এবার ধানের বাম্পার ফলন হলেও কৃষক তার নায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন।
কৃষি বিভাগের পরামর্শ
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হোমাইরা মন্ডল বলেন, জেলায় মাত্র ২৫-৩০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। কৃষকরা এখন তড়িঘড়ি করে ভেজা ধান বিক্রি করছেন বলেই কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না। ধান শুকিয়ে বাজারে আনলে এবং সরকারি ক্রয় অভিযান শুরু হলে তারা ন্যায্য মূল্য পাবেন।
এছাড়া, সরকারি গুদামগুলোতে ধান ক্রয় শুরু হলে অবস্থার আরও উন্নতি হবে বলে মনে করেন তিনি। এই কর্মকর্তার মতে, প্রথম দিকে ধান বিক্রি না করে চাষিদের একটু ধৈর্য ধরা উচিৎ। ভরা মৌসুমে ধান বিক্রি করলে সব কৃষকই চলতি বছরের বাম্পার ফলনের সুফল ঘরে তুলতে পারবেন।
তবে নওগাঁর কৃষি-সংশ্লিষ্ট সচেতন মহল মনে করে, শুধু ফলন ভালো হলেই হবে না, প্রান্তিক চাষিদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে কৃষি প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ জরুরি। অন্যথায় বারবার লোকসানের মুখে ধান চাষে আগ্রহ হারাবে এই অঞ্চলের কৃষকরা।
৫ ঘণ্টা আগে
প্রকৃতি ও মানবসৃষ্ট অব্যবস্থাপনার দ্বিমুখী ছোবলে দিশেহারা সুনামগঞ্জের কৃষক
সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর জনপদ এখন পরিণত হয়েছে শোকের উপত্যকায়। একদিকে আকাশ থেকে নেমে আসা বজ্রের মরণঘাতী ছোবল, অন্যদিকে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর অতিবৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের সারা বছরের অন্ন জোগানোর সম্বল বোরো ধান।
প্রকৃতি ও মানবসৃষ্ট পরিস্থিতির নিষ্ঠুরতায় দিশেহারা হাওরবাসী এখন এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখে। বছরের পর বছর বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও তা রোধে সরকারি উদ্যোগগুলো যেন কেবলই লোক দেখানো।
সরকারি নথিতে বজ্রপাত প্রতিরোধে ২০১৮ সালে ১ লাখ এবং ২০২৪ সালে আরও দুই হাজার তালগাছ রোপণের তথ্য থাকলেও, বাস্তবে হাওরজুড়ে সেগুলোর কোনো চিহ্ন নেই। সঠিক পরিচর্যার অভাবে চারাগুলো বড় হয়ে ওঠার আগেই মরে গেছে।
কোটি টাকা ব্যয়ে বসানো বজ্রনিরোধক দণ্ডেরও একই দশা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৮টি বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হলেও তা হাওরবাসীর কোনো কাজে আসছে না।
গত পাঁচ বছরে জেলায় বজ্রাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৭২ জন। জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ পুনর্বাসন শাখার তথ্যমতে, চলতি বছরে এপ্রিল পর্যন্তই অকালে প্রাণ হারিয়েছেন ৯ জন। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বোরো মৌসুমে মাঠে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষক ও জেলেরা।
জেলা প্রশাসক মিনহাজুর রহমান জানান, তালগাছ রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে তদন্তের পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
তবে ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দোহাই দিয়ে আর কত লাশ পড়বে? তাদের দাবি, দ্রুত আধুনিক ও কার্যকর প্রযুক্তির ব্যবস্থা করাই এখন সময়ের দাবি। প্রকৃতির চরম বৈরিতার পাশাপাশি মানুষের তৈরি অব্যবস্থাপনা কৃষকের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।
এদিকে, গত সোম ও মঙ্গলবার রেকর্ড ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওরসহ বিভিন্ন স্থানে বুক সমান পানিতে তলিয়ে গেছে আধপাকা ধান। মাঠের অর্ধেক ধান এখনও অবিন্যস্ত। শ্রমিক সংকট ও বৈরী আবহাওয়ায় হারভেস্টার মেশিনও অকেজো হয়ে পড়ায় অসহায় কৃষক নিজের চোখের সামনেই দেখছেন স্বপ্নের মৃত্যু।
জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওরের কবিরপুর গ্রামের কৃষক জায়েদ মিয়া জানান, ১৫ কেদার জমি আবাদ করেছিলেন। মাত্র ৫ কেদার জমির ফসল তুলতে পেরেছেন। গত দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে সব জমি তলিয়ে গেছে। কৃষি শ্রমিক সংকট থাকায় অনেক চেষ্টা করেও ফসল ঘরে আনতে পারেননি তিনি।
জগন্নাথপুর সদর গ্রামের আবুল হোসেন জানান, পিংলার হাওরে ১০ কেদার জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। এখন পর্যন্ত মাত্র ২ কেদারের ধান কাটা হয়েছে। শ্রমিক সংকটের কারণে কাটা যাচ্ছে না। অন্যদিকে, হাওরে পানি ঢুকে ধান তলিয়ে যাচ্ছে। খুবই দুশ্চিন্তায় আছেন তারা।
৬ দিন আগে
তিস্তা প্রকল্পে ৬০ কোটি টাকার ডিজেল সাশ্রয়, সুফল পাচ্ছেন ১০ লাখ কৃষক
দেশের উত্তরাঞ্চলের চার জেলার কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে তিস্তা সেচ প্রকল্প। জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ সংকটে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সেচ কার্যক্রম বিঘ্নিত হলেও এই প্রকল্পের মাধ্যমে নির্বিঘ্নে পানি পাওয়ায় স্বস্তিতে আছেন কৃষকরা। এতে উৎপাদন বৃদ্ধিরও প্রত্যাশা করছেন তারা।
চলমান বোরো মৌসুমে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটে দেশের অনেক স্থানে সেচ কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। আর এই সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৬০ কোটি টাকার ডিজেল সাশ্রয় হচ্ছে বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মিজানুর রহমান।
তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় উত্তরের চার জেলার প্রায় ১০ লাখ কৃষক কোনো ধরনের বাড়তি ভোগান্তি ছাড়াই বোরো আবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন। ডিজেল ও বিদ্যুচ্চালিত সেচের তুলনায় সাশ্রয়ী ও মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হওয়ায় প্রতি বছরই এ প্রকল্পের দিকে ঝুঁকছেন কৃষকরা। ফলে প্রতি বছরই বাড়ছে আবাদি জমির সংখ্যা। যদি তিস্তা খনন করে এই খালগুলোর পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করা হয় তবে কৃষকরা সুবিধা পাবেন, আর উৎপাদনও কয়েক গুণ বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
রংপুর পাউবোর উপপ্রধান সম্প্রসারণ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি (২০২৫-২৬) বোরো মৌসুমে উত্তরের চার জেলার মোট ১২ উপজেলার ৫০ হাজার হেক্টর জমি তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় এসেছে। প্রকল্পের আওতায় নীলফামারী জেলার পাঁচটি উপজেলায় (সদর, ডিমলা, জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ ও সৈয়দপুর) ৩২ হাজার হেক্টর, দিনাজপুর জেলার তিনটি উপজেলায় (খানসামা, চিরিরবন্দর ও পার্বতীপুর) ৬ হাজার হেক্টর, বগুড়ায় ২৩ হাজার হেক্টর এবং রংপুর জেলার চারটি উপজেলায় (সদর, গংগাচড়া, তারাগঞ্জ ও বদরগঞ্জ) ২৭ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। তিস্তা নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে বিভিন্ন খালের মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
সরজমিনে দেখা যায়, গঙ্গাচড়া উপজেলার সয়রা বাড়ি ও বাকপুর পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার খালের মাধ্যমে তিস্তা নদীর পানি এনে প্রায় ১৩০ একর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে নদীতে ৮ থেকে ৯ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহিত হচ্ছে, গত বছরের এ সময়ে যা ছিল মাত্র ৩ হাজার কিউসেক।
তিস্তা প্রকল্পের সেচব্যবস্থায় সন্তুষ্ট স্থানীয় কৃষকরা। এ বিষয়ে গংগাচড়ার বড়বিল ইউনিয়নের কৃষক আব্দুস সালাম জানান, অন্য উৎস থেকে এক একর জমিতে সেচ দিতে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। তবে তিস্তা প্রকল্পের মাধ্যমে বছরে মাত্র ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় সেচ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি এক একর জমিতে ৮৫ থেকে ৯০ মণ ফলনের আশা করছেন।
কৃষকদের মতে, তিস্তার পানিতে থাকা পলি মাটির উর্বরতা বাড়ায়।
আলমবিদিতর ইউনিয়নের পানি ব্যবস্থাপনা দলের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলী বলেন, তিস্তার পানিতে পলি থাকায় জমিতে একটি আস্তরণ তৈরি হয়, যা দীর্ঘক্ষণ পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে। এতে গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত হওয়ায় রাসায়নিক সারের ব্যবহার অনেক কমে আসে। ফলে অন্য সেচ ব্যবস্থার তুলনায় এখানে বিঘাপ্রতি তিন-চার মণ ফলন বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে, তিস্তা প্রকল্পের সুবিধার পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বাকপুর পানি ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল মালেক জানান, ফেব্রুয়ারির আগে পানি না পাওয়ায় অনেককে বীজতলা তৈরির সময় বিকল্প উৎস ব্যবহার করতে হয়েছে। এছাড়া কাঁচা খালে ইঁদুরের গর্ত এবং উঁচু-নিচু জমিতে পানি পৌঁছানোর সমস্যাও রয়েছে।
অপরদিকে, নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় কিছু খালের সংস্কারকাজের জন্য সাময়িকভাবে পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। জানুয়ারির শুরু থেকেই পানি সরবরাহ নিশ্চিত করাসহ বিদ্যমান সমস্যা দূর করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পাউবো রংপুরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘তিস্তা সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৬০ কোটি টাকার ডিজেল সাশ্রয় হচ্ছে। চৈত্র মাসে আগাম বৃষ্টির কারণে এবার নদীতে পানি বেশি, জলবায়ু পরিবর্তনের সুফল পাচ্ছেন কৃষকরা।’
সেচের সময় এগিয়ে আনার দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ধান, তামাক, ভুট্টাসহ ভিন্ন ভিন্ন ফসলের কারণে সেচের সময় সমন্বয় করতে হয়। কৃষকরা যদি একই ধরনের ফসল আবাদ করেন, তবে এ সমস্যা নিরসন সম্ভব। বেশকিছু খালের সংস্কারকাজ চলায় এ বছর জমির পরিমাণ আর বাড়ানো সম্ভব হয়নি, তবে আগামী দুই মাস এ সরবরাহ অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
১০ দিন আগে
ডিজেল সংকটে বেড়েছে হারভেস্টারের ভাড়া, বিপাকে হাওরাঞ্চলের কৃষক
সিলেট বিভাগের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরু হলেও ডিজেল সংকট ও নতুন করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতে। সময়মতো ধান কাটতে না পারার আশঙ্কার পাশাপাশি বাড়তি খরচের চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা।
দ্রুত ফসল ঘরে তুলতে কম্বাইন হারভেস্টারের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও ভাড়ার হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
কৃষকদের দাবি, এক বছর আগেও প্রতি একর জমির ধান কাটতে যেখানে সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা খরচ হতো, বর্তমানে তা বেড়ে সাড়ে ৭ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। কোথাও কোথাও এর চেয়েও বেশি ভাড়া দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেলেও ধানের বাজারমূল্য সে অনুপাতে না বাড়ায় কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের চার জেলায় বর্তমানে ১ হাজার ৪৭৩টি কম্বাইন হারভেস্টার সক্রিয় রয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় এ সংখ্যা এখনও অপর্যাপ্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের কৃষক সেলিম রেজা চৌধুরী বলেন, এবার ধান ভালো হয়েছে, কিন্তু কাটার সময় এসে আমরা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছি। এক একর জমি কাটতে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে চাইলেও অনেক সময় হারভেস্টার পাওয়া যাচ্ছে না। দিন যত যাচ্ছে, খরচ তত বাড়ছে। বৃষ্টি হলে বা আগাম বন্যা এলে ফসল নষ্ট হওয়ার ভয় তো আছেই।
তিনি বলেন, ধানের দাম এখনও তেমন বাড়েনি। একদিকে সার, বীজ, সেচ—সবকিছুর খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে কাটাই ও মাড়াইয়ের খরচও দ্বিগুণ। সব মিলিয়ে হিসাব করলে লোকসান ছাড়া কিছুই থাকছে না।
অনেক কৃষক ঋণ করে চাষ করেছেন, এখন সেই ঋণ পরিশোধ নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বলে জানান তিনি।
একই উপজেলার আরেক কৃষক আবদুল করিম বলেন, আমরা বাধ্য হয়ে অপেক্ষা করছি, কখন হারভেস্টার পাওয়া যাবে। অনেকেই আবার দলবেঁধে মেশিন বুকিং দিচ্ছেন, কিন্তু সংকট এত বেশি যে সময়মতো ধান কাটা যাচ্ছে না। এতে জমিতে পাকা ধান পড়ে থাকার ঝুঁকি বাড়ছে।
তাহিরপুর উপজেলার বালিজুড়ি এলাকার হারভেস্টার মালিক মঈনুল ইসলাম বলেন, আমাদেরও পরিস্থিতি ভালো নয়। ডিজেল ছাড়া মেশিন চালানো সম্ভব নয়, কিন্তু ডিলারদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে ছাড়পত্র নিয়েও পর্যাপ্ত জ্বালানি মিলছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে বেশি দামে ডিজেল কিনতে হচ্ছে। আগে যেখানে নির্দিষ্ট দামে ডিজেল পাওয়া যেত, এখন সেখানে অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে। যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ খরচও বেড়েছে। সব মিলিয়ে ভাড়া না বাড়িয়ে আমাদের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব না।
হারভেস্টারচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দিনরাত কাজ করেও চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। অনেক জায়গা থেকে ফোন আসে, কিন্তু সময় মেলানো যায় না। ডিজেল সংকট থাকায় একটানা কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, জেলায় প্রকৃতপক্ষে কোনো জ্বালানি সংকট নেই, তবে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার কারণে বিতরণে কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
১৩ দিন আগে
রংপুরের কৃষিতে সৌর বিপ্লব, মৌসুমে সাশ্রয় ৭৫ লাখ লিটার ডিজেল
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা, সরবরাহ শঙ্কা এবং দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতির আশঙ্কার মধ্যে বাংলাদেশের কৃষিখাতেও চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে সেচ মৌসুমে ডিজেলনির্ভর কৃষকদের উদ্বেগ এখন চরমে।
এমন বাস্তবতায় রংপুর অঞ্চলে আশার আলো হয়ে উঠেছে সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচব্যবস্থা। সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৫ দশমিক ৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এতে একেকটি সেচ মৌসুমে প্রায় ৭৫ লাখ লিটার ডিজেল সাশ্রয় সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষকেরা বলছেন, ডিজেল সংকট, মূল্যবৃদ্ধি কিংবা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ভোগান্তি ছাড়াই এখন সময়মতো জমিতে পানি দেওয়া যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ কমছে, বাড়ছে আবাদও।
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়নের দোয়ানী গ্রামে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) পরিচালিত একটি ডাগওয়েলের দায়িত্বে আছেন আতিয়ার রহমান।
তিনি বলেন, এলাকায় ব্যাপকভাবে ভুট্টা ও বিভিন্ন সবজি চাষ হয়। এই সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্র দিয়ে প্রায় ১৫ বিঘা জমিতে নিয়মিত পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
তিনি জানান, ‘ডিজেল পাওয়া না গেলে বা দাম বাড়লেও কৃষকদের এখন আর চিন্তা করতে হয় না। কারণ এই সেচযন্ত্র চলে সৌরবিদ্যুতে।’
পাশাপাশি তিনি একটি বড় সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন। তার মতে, বছরে মাত্র চার মাস সেচকার্যে ব্যবহারের পর বাকি আট মাস সৌর বিদ্যুতের প্যানেলগুলো প্রায় অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। এই সময়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে নেট মিটারিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে কৃষক, প্রতিষ্ঠান ও সরকার—সবাই লাভবান হতে পারে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সৌর বিদ্যুতের প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি পাম্প চালিয়ে কৃষিজমিতে পানি পৌঁছে দিচ্ছে। কোথাও ডিজেলের ধোঁয়া নেই, নেই জ্বালানি সংগ্রহের দৌড়ঝাঁপ, নেই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার উৎকণ্ঠা।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মধুপুর গ্রামের কৃষক সুধাম চন্দ্র সেন বলেন, তেলের চিন্তা নাই। সোলার থেকে বিদ্যুৎ হয়, পানি পাই। ফসলও ভালো হয়, খরচও কম লাগে।
তিনি আরও বলেন, আগে বিদ্যুৎ থাকত, আবার থাকত না। অনেক সময় জমিতে পানি দিতে দেরি হতো। এখন সোলারে সবসময় পানি পাওয়া যায়।
নদী বাঁচাও তিস্তা বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের লালমনিরহাট জেলা ইউনিটের সভাপতি শফিকুল ইসলাম বলেন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষিকে আধুনিক করার জন্য এ ধরনের প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, প্রান্তিক কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সৌরচালিত সেচ প্রকল্প আরও বাড়ানো দরকার।
বিএডিসি রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী (নির্মাণ) হুসাইন মোহাম্মদ আলতাফ জানান, ২০২২ সালের পর নতুন কোনো সৌর সেচ প্রকল্প চালু হয়নি। তবে আগের স্থাপনাগুলো এখনও সচল রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গত সেচ মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ৫৯৬টি সৌরচালিত সেচযন্ত্র সচল ছিল। প্রতিটি যন্ত্রে গড়ে ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরা হলে মোট উৎপাদন দাঁড়ায় ৫ হাজার ৯৬০ কিলোওয়াট বা ৫ দশমিক ৯৬ মেগাওয়াট। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ হাজার ফ্যান চালানো সম্ভব। একইসঙ্গে চার মাসের সেচ মৌসুমে প্রায় ৭৫ লাখ লিটার ডিজেল সাশ্রয় হয়।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) রংপুর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান খান বলেন, তাদের আওতায় নতুন প্রকল্প না এলেও পুরোনো প্রকল্প চালু আছে। মাঠ পর্যায়ে দুটি নেট মিটারিং ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এছাড়া অফিস ভবনের সৌর বিদ্যুৎও নেট মিটারিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে।
নেসকো রংপুরের প্রধান প্রকৌশলী (অপারেশন) মিজানুর রহমান বলেন, ডিজেলনির্ভর সেচ থেকে সৌরচালিত সেচে দ্রুত রূপান্তর ঘটাতে পারলে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণও কমবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি হতে পারে টেকসই কৃষির কার্যকর পথ।
তিনি আরও বলেন, অধিকাংশ সৌরচালিত সেচযন্ত্র পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন এলাকায় রয়েছে। তাই এসব স্থাপনায় নেট মিটারিং চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে বাস্তবায়ন সম্ভব।
কৃষকদের দাবি, নতুন করে সৌর সেচ প্রকল্প চালু হোক, পুরোনো প্রকল্প সংস্কার হোক আর অব্যবহৃত সময়ের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হোক।
১৬ দিন আগে
সেচ খরচ কমাতে সোলার সিস্টেমে যাচ্ছে সরকার: কৃষিমন্ত্রী
কৃষি খাতে উৎপাদন ব্যয় কমাতে সরকার ডিপটিউবওয়েল ও শ্যালো মেশিনে সোলার সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি জানান, এজন্য কৃষকদের ভর্তুকি দেওয়া হবে, ফলে অর্ধেক খরচে সোলার সুবিধা পাবেন তারা।
শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সকালে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার বিবিরবাজার এলাকায় কৃষক কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, কৃষকদের সেচ খরচ কমাতে ধাপে ধাপে সোলার সিস্টেমে রূপান্তর করা হবে। এতে জ্বালানি নির্ভরতা কমবে এবং কৃষি উৎপাদন আরও লাভজনক হবে।
তিনি আরও বলেন, বিএনপির ৩১ দফার অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল কৃষি কার্ড প্রদান। তখন এ উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনা হলেও সরকার গঠনের পর দ্রুতই ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ড বিতরণ শুরু হয়েছে। ভোটের কালি শুকানোর আগেই সরকার তার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে ১ হাজার ৪৫৮ জন কৃষকের মাঝে কৃষি কার্ড বিতরণ করা হয়।
এ সময় বক্তব্য রাখেন কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহাম্মদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব দেলোয়ার হোসেন এবং কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু।
কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান।
১৮ দিন আগে
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষকদের সহায়তায় বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার: কৃষিমন্ত্রী
দেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকদের সার্বিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মেদের (কুষ্টিয়া-১) সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষকদের জীবনমান উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং কৃষিখাতে সার্বিক সহায়তা প্রদানে সরকার কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার একটি ‘প্রাক-পাইলটিং’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এর আওতায় প্রতি কৃষককে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে প্রণোদনা দেওয়া হবে। এই অর্থ সার, বীজ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণের জন্য ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের মাঝে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে বিতরণ করা হবে।
মন্ত্রী সংসদকে অবহিত করেন যে, বর্তমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন ও প্রণোদনা কর্মসূচির জন্য ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৪০১ দশমিক ৬০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে, যার ফলে প্রায় ২৫ লাখ ২২ হাজার কৃষক বিনামূল্যে বীজ, সার ও কীটনাশক সুবিধা পেয়েছেন।
এছাড়া কৃষকদের আর্থিক বোঝা কমাতে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে সরকার। ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই উদ্যোগের ফলে প্রায় ১২ লাখ কৃষক সরাসরি উপকৃত হয়েছেন।
শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচির কথা স্মরণ করে মন্ত্রী জানান, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও ফলন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনর্খনন করার একটি বিশাল প্রকল্প বর্তমানে চলমান রয়েছে।
প্রয়োজনীয় উপকরণের সরবরাহ প্রসঙ্গে আমিন উর রশিদ বলেন, সরকার সার এবং সেচ কাজে ব্যবহৃত বিদ্যুতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি প্রদান করেছে। চলতি অর্থবছরে সরকার ভর্তুকি মূল্যে ২৬ লাখ টন ইউরিয়া, শূন্য দশমিক ৯৫ লাখ টন টিএসপি, ১ দশমিক ০৫ লাখ টন এমওপি এবং ১ দশমিক ৬৮৫ লাখ টন ডিএপি সার সরবরাহ করেছে।
কৃষিপণ্য সংরক্ষণে সরকারের অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান কৃষকের উৎপাদিত শাক-সবজি ও ফলমূল সংরক্ষণের জন্য দেশে ১৮০টি মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া আলু সংরক্ষণের জন্য ৭০৩টি মডেল আলু সংরক্ষণাগার এবং পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য ৮০০টি মডেল পেঁয়াজ সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা হয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, এসব নীতির ফলে ধান, ভুট্টা, আলু ও সবজির উৎপাদন ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সরকার এই প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে অঙ্গীকারবদ্ধ।
৩৫ দিন আগে
হঠাৎ বৃষ্টিতে কপাল পুড়ল উত্তরের আলু চাষিদের
উত্তরের জেলাগুলোতে আলুর দামে ধস নামার মধ্যেই অকাল বৃষ্টিতে নতুন করে বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া ও ভারী বৃষ্টিতে আলুখেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক জায়গায় বৃষ্টির পানিতে খেত তলিয়ে যাওয়ায় আলুতে পচন ধরার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। দরপতনের হাহাকারের মাঝেই প্রাকৃতিক দুর্যোগে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন আলুচাষিরা।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) এবং শুক্রবার ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত হওয়া বৃষ্টিতে রংপুর নগরীর মাহিগঞ্জ, আমাশু কুকরুল, সদরের পালিচড়া ও পীরগাছা উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পীরগাছা উপজেলার তাম্বুলপুর, ছাওলা, অন্নদানগর ও কান্দি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ আলুখেত পানিতে তলিয়ে আছে। ফসল রক্ষায় খেত থেকে পানি সরানোর চেষ্টা করছেন কৃষকরা।
উপজেলার ছাওলা ইউনিয়নের কৃষক ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘১০ বিঘা জমিতে আলুর আবাদ করছি, ফলনও ভালো হইছে। কিন্তু হঠাৎ করে ঝড়বৃষ্টিতে আলুর অনেক ক্ষতি হইল। সকালে এসে দেখি আলুখেতে অনেক পানি জমে গেছে। এখন পানি কমানোর চেষ্টা করতেছি।’
তিনি বলেন, ‘বাজারে আলুর দাম নাই, কেজি মাত্র ৮ থেকে ১০ টাকা। এখন বৃষ্টির কারণে কেজিপ্রতি আরও দুই টাকা কমে যাবে। এ অবস্থায় মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে গেল এই বৃষ্টি।’
আলুচাষি এমদাদুল হক বাবু বলেন, সারের সংকট ও দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ধারদেনা করে আলু চাষ করে এখন বিপাকে আছি। বাজারে দাম নেই। কোল্ড স্টোরে রাখতে হলে বাড়তি টাকা গুণতে হচ্ছে। না হয় কালোবাজারি ও সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের কাছে অল্প দামে আলু বিক্রি করতে হবে। এ কারণে খেতের মধ্যেই আলু রেখেছিলাম। দাম ভালো মিললে বিক্রি করব। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টিতে সব শেষ হয়ে গেল।
৫৩ দিন আগে
আলু নিয়ে বেকায়দায় চাঁদপুরের চাষি ও হিমাগার কর্তৃপক্ষ
আলুর বাজারদরে ধস নামায় চাঁদপুরের আলুচাষিরা চরম বেকায়দায় পড়েছেন। হিমাগারে রাখা আলু তারা যেমন তুলতে পারছেন না, তেমনি গত মৌসুমে বাকিতে কেনা আলুবীজের ধারদেনাও মেটাতে পারছেন না। এতে বিপাকে পড়েছে হিমাগার কর্তৃপক্ষও।
জেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় আলুচাষির সংখ্যা ৫৬ হাজার ৮৬০ জন। সবচেয়ে বেশি আলু চাষ হয় চাঁদপুর সদর, মতলব দক্ষিণ ও কচুয়া উপজেলায়। এসব উপজেলার প্রত্যেকটিতে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়।
সরেজমিনে বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, সাপ্তাহিক হাটবাজারে এখনো পুরোনো আলু মাত্র ৭–৮ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে শহর ও গ্রামীণ হাটবাজারে আমদানি বেড়ে যাওয়ায় প্রায় সব ধরনের সবুজ শাকসবজির দাম কমেছে। শিম, বরবটি, করলা ও গাজর বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজিতে, টমেটো ৪০ টাকা কেজিতে। মাত্র ১৫–২০ দিন আগেও এসব সবজির দাম ছিল ৯০ থেকে ১২০ টাকা কেজি।
আলুর দাম কমে যাওয়ায় বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়ে এবার জেলায় অনেক চাষি আলু চাষে বিমুখ হয়েছেন। তারপরও জেলার বিভিন্ন স্থানে নতুন মৌসুমে অনেক চাষিকে আবার আলু বপনে ব্যস্ত দেখা যাচ্ছে। সদর, কচুয়া ও মতলব দক্ষিণের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষিবিদ মোবারক হোসেন ইউএনবিকে বলেন, এবার আলুর বাজারে কোনো সিন্ডিকেট না থাকায় দাম কমই থাকবে। তিনি বলেন, ‘গত মৌসুমে সিন্ডিকেটের কারণে ক্রেতাদের ৮০ টাকা কেজিতে আলু কিনতে হয়েছে। এবার সে পরিস্থিতি নেই।’
কচুয়া উপজেলায় হিমাগারে আলু রাখা চাষিরা মারাত্মক সংকটে আছেন। একইভাবে বিপাকে পড়েছে হিমাগার কর্তৃপক্ষও। উপজেলার তিনটি হিমাগারে বিপুল পরিমাণ আলু মজুত আছে। বাজারদর পানির দরে নেমে আসায় প্রকৃত চাষিরা আলু বের করছেন না। ফলে হিমাগারের ভাড়া আদায় করতে পারছেন না কর্মচারীরা।
দুই হিমাগার ব্যবস্থাপক মঙ্গল খান ও ইয়াছিন মিয়া জানান, চাষিরা আলু না তুললে বা ফেরত না নিলে সেগুলো বিক্রি করেও ভাড়ার টাকা আদায় সম্ভব হচ্ছে না। কারণ হাটবাজারে আলুর দাম অত্যন্ত কম।
গত মৌসুমে জেলায় আলুর বাম্পার ফলন হয়েছিল। বর্তমানে বাজারে ভালো মানের পুরোনো আলু ৮–১০ টাকা কেজিতে এবং নতুন আলু ২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
হাজীগঞ্জ উপজেলার বাণিজ্যিক কেন্দ্র বাকিলা বাজারে প্রবীণ আলুচাষি ও বিক্রেতা বাচ্চু মিজি বলেন, ‘আমার জমিতে ১০০ মণ আলু হয়েছে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি, পুরোটাই লস।’
তিনি ও অন্য চাষিরা জানান, সামনে তারা আর আলু চাষ করতে চান না।
সদরের শাহ মাহমুদপুর এলাকার চাষি বাবুল, মকবুল, জহুরুল হক, হানিফ পাটোয়ারি ও তার ছেলেরাও একই হতাশার কথা জানান।
হানিফ পাটোয়ারি বলেন, ‘গত মৌসুমের আলুবীজের টাকাই এখনো দিতে পারিনি। যে লস খেয়েছি, সামনে আর আলু চাষ করব না।’ তিনি আরও জানান, বাবুরহাট বিসিক শিল্পনগরীর হিমাগারে রাখা তার ৩৩ বস্তা (প্রতি বস্তা ৫০ কেজি) আলু বস্তাপ্রতি মাত্র ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে।
কচুয়া উপজেলাতেও আলুচাষিদের অবস্থা ভালো নয়। লাভের আশায় তারা আলু হিমাগারে রেখেছিলেন। কিন্তু বাজারদর কম থাকায় সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। নভেম্বর ও ডিসেম্বরের শুরুতে আলু ফেরত নেওয়ার কথা থাকলেও এখনো অর্ধেকের বেশি আলু হিমাগারে পড়ে আছে। এতে কচুয়ার হিমাগার কর্তৃপক্ষের হতাশাও বাড়ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে জেলা সদর, হাইমচর, কচুয়া, মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণ উপজেলায় অধিকাংশ মাঠে আলু রোপণ ও বপনের কাজ চলছে। কোথাও জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে, আবার কোথাও শ্রমিক নিয়ে আলু রোপণ ও বপনে ব্যস্ত চাষিরা।
সদরের বাগাদীর শামসুল ইসলাম ও ধনপর্দির ইসমাইল হোসেন ও সুরুজ মিয়া জানান, গত বছর তারা আলুর ন্যায্য দাম পাননি। তাই এবার কম বা অর্ধেক জমিতে আলু চাষ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবারও বাম্পার ফলনের আশা করছেন, তবে ভালো দাম পাওয়া যাবে কি না—তা নিয়ে তারা সন্দিহান।
অতি সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জ থেকে নৌপথে চাঁদপুরের বাজারে নতুন আলু আসতে শুরু করেছে। তবে নতুন আলুর দাম ৭০ টাকা কেজি থেকে নেমে ২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এতে ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে। বর্তমানে ৫ কেজি নতুন আলু ১০০ টাকা, আর ১০ কেজি পুরোনো আলু ৫০–৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কৃষিবিদ মোবারক হোসেন আরও জানান, জেলায় বর্তমানে ১০টি হিমাগার চালু রয়েছে। এতে মোট ৮০ হাজার ১৬৯ টন আলু সংরক্ষিত আছে। এসব হিমাগারের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ৮০ হাজার ২৫০ টন। তার মতে, যদি সিন্ডিকেট থাকত, তাহলে বাজারে আলুর দাম ৭০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে উঠত।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক কৃষিবিদ আবু তাহের ইউএনবিকে বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ হাজার ২০০ হেক্টর, যা গতবারের তুলনায় ১ হাজার হেক্টর কম। এর প্রধান কারণ হলো, চাষিরা আলুর প্রকৃত দাম না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন এবং আগের দেনা পরিশোধ করতে পারছেন না।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় চাষিদের সঙ্গে কথা বলে তিনি দেখেছেন, দাম ভালো পেলে চাষিরা স্বাভাবিকভাবেই সেই ফসল চাষে আগ্রহী হন।
১২৩ দিন আগে
মাটি পরীক্ষার সুফল অধরা, কাঙ্ক্ষিত পরামর্শ পাচ্ছেন না সুনামগঞ্জের কৃষকেরা
সুনামগঞ্জে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট হাওরের কৃষি উন্নয়নে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের নানা পরামর্শ দেওয়ার কথা থাকলেও কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত পরামর্শ পাচ্ছেন না। মাটি পরীক্ষার পর সংশ্লিষ্টরা পরামর্শ দিলেও অনেক ক্ষেত্রে কৃষক তা মানছেন না। তাছাড়া মাটি পরীক্ষা করে কৃষির উন্নয়নে কৃষকেরা উদ্যোগী হবেন—এই কার্যক্রমের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায়ও স্বাভাবিক গতি কমতে দেখা গেছে।
চাষবাসের উন্নয়নে ফসল ফলানোর লক্ষ্যে কোন মাটিতে কীভাবে পরিচর্যা করতে হয়, এ বিষয়ে প্রশিক্ষণসহ মাটির গুণাগুণ বিশ্লেষণ করে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়ার কথা রয়েছে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের।
সংস্থাটির একটি সূত্র জানিয়েছে, হাওরের কৃষক ও অন্যান্য উপকারভোগীদের মাটি, পানি, উদ্ভিদ ও সার বিশ্লেষণ সেবা এবং মৃত্তিকা নমুনা বিশ্লেষণের ফলাফল অনুসারে স্থানভিত্তিক ফসল চাষের জন্য সার প্রয়োগের সুপারিশ করার কথা প্রতিষ্ঠানটির। এছাড়া জেলার মাটির উর্বরতা এবং ভূমির উৎপাদন কার্যক্রম প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করে ফলাফলও যথাযথভাবে প্রয়োগ করার কথা।
মৃত্তিকা বিশ্লেষণের ফলাফল, মৃত্তিকা স্বাস্থ্য কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং মৃত্তিকা বিশ্লেষণের ফলাফলের ভিত্তিতে বিভিন্ন ফসল চাষে সার প্রয়োগের বিশেষ সুপারিশ করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়াও মাটির উর্বরতা অবক্ষয় সমস্যা, ফসলের পুষ্টি উপাদানের সমস্যা, মৃত্তিকা রসের অভাব এবং ফসল উৎপাদনে বাধা ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টরা।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় প্রায় পৌনে চার লাখ কৃষক পরিবার রয়েছে, যাদের বেশিরভাগই হাওরের বোরো জমির ওপর নির্ভরশীল। সনাতন পদ্ধতিতে দীর্ঘদিন ধরে তারা চাষবাস করে আসছেন। এখনো আধুনিক কৃষির সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়নি। তাই কৃষির ফলনে তারা পিছিয়ে আছেন।
এদিকে ২০২১ সালে হাওর জেলা সুনামগঞ্জে কার্যক্রম শুরুর পর সুনামগঞ্জ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট ৪ হাজার ৪৬০ জন কৃষককে সার প্রয়োগের সুপারিশ করেছে বলে জানা গেছে। কখনো মাঠ থেকে, কখনো কৃষকরা মাটির নমুনা অফিসে নিয়ে এসে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করাচ্ছেন। এই পরীক্ষার আলোকে ফসল উৎপাদনে কাঙ্ক্ষিত ফলনের জন্য সংশ্লিষ্টরা কৃষকদের সার প্রয়োগের সুপারিশ করছেন। এজন্য তাদের বিশেষ কার্ডও দেওয়া হচ্ছে।
পাশাপাশি অনলাইনেও কৃষকরা পূর্ণ ঠিকানা নিবন্ধন করলে অফিসের লোকজন মাঠে গিয়ে মাটির নমুনা এনে পরীক্ষার সুযোগ করে দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়াও কৃষি অফিসের মাধ্যমে জেলার সুনামগঞ্জ সদর, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার, ছাতক, জগন্নাথপুর, দিরাই, জামালগঞ্জ ও শান্তিগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ গবেষণাগারে প্রশিক্ষণ ও মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করা হয়েছে। এসব উপজেলায় ৫০ জন করে কৃষককে গবেষণাগার পরিদর্শন করিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউট সংশ্লিষ্টরা।
তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কার্যক্রম চালুর পর ২০২১-২০২২ অর্থবছরে কৃষকদের সার সুপারিশ সেবার পরিসংখ্যান বেশি দেওয়া হলেও এখন এই গতি কমে এসেছে। চলতি বছর মাত্র ৪৬০ জন কৃষককে সার সুপারিশ কার্ড প্রদান করা হয়েছে।
তালিকা ধরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যারা উপজেলা কৃষি অফিসে মাটির নমুনা দিয়ে মাটি পরীক্ষা করিয়েছিলেন, তারা কোনো পরামর্শ পাননি। তাই পরীক্ষার পর তাদের কী করতে হবে, এ বিষয়ে তারা ওয়াকিবহাল নন।
দিরাই উপজেলার শরিফপুর গ্রামের কৃষক জামাল হোসেন বলেন, আমি বছরখানেক আগে দিরাই কৃষি অফিসে খেতের মাটি দিয়ে এসেছিলাম। তারপরও আমাকে তারা কিছুই জানায়নি। আমি আগে যেভাবে চাষ করতাম, এখনও একইভাবে চাষ করতেছি।
ধর্মপাশা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, আমি দুই বছর আগে মাটি দিয়ে আসছিলাম। পরে আমাকে কিছু জানায়নি। আমি আমার মতো করে চাষ করি।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী গ্রামের কৃষক ইকবাল হোসেন বলেন, আমি মাটি পরীক্ষা করিয়েছিলাম, কিন্তু তারা জমিতে যে পরিমাণ সার প্রয়োগ করার কথা বলেছে, তা দিলে উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
প্রতি শতাংশে ১ কেজি ৪০০ গ্রাম সার প্রয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের হিসাব মানলে প্রতি কেয়ারে (প্রতি ৩০ শতাংশে এক কেয়ার) ৪০ কেজির ওপর সার প্রয়োগ করতে হবে। এতে খরচ দ্বিগুণ বেড়ে যাবে। তাই তাদের সুপারিশ না মেনে নিজের মতো করে চাষ করছি।
সুনামগঞ্জ মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, মাটি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে আমরা সার প্রয়োগ সুপারিশ করে থাকি। এটা মানলে ফলন বেড়ে যাবে এবং রোগবালাইও প্রতিরোধ হবে। তবে কেউ না মানলে তো আমাদের কিছু করার নেই।
তবে পরীক্ষা করার পরও যারা সুপারিশ কার্ড পাননি, তাদের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান এ কর্মকর্তা।
১২৬ দিন আগে