ভ্রমণ বিপর্যয়
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতি: ভ্রমণ বিপর্যয়ে দিশেহারা হজযাত্রীরা
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির ফলে সৃষ্ট ভ্রমণ বিপর্যয়ে বিপাকে পড়েছেন ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে যাওয়া হজযাত্রীরা। ইতোমধ্যে অনেক যাত্রী সেখানে আটকা পড়েছেন এবং ঘরে ফেরার বিকল্প পথ খুঁজছেন। আবার অনেককে তাদের পরিকল্পিত সফর পুরোপুরি বাতিল করতে হয়েছে।
ওমরাহ সম্পন্নকারী অনেকের মনেই ইসলামের পবিত্র স্থান দর্শনের অভিজ্ঞতার ওপর বিষাদের ছায়া ফেলেছে যুদ্ধ পরিস্থিতি।
ইন্দোনেশিয়ার হজ ও ওমরাহবিষয়ক উপমন্ত্রী দাহনিল আনজার সিমানজুন্তাকের মতে, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) পর্যন্ত ৫৮ হাজার ৮৬০ জনেরও বেশি ইন্দোনেশীয় ওমরাহযাত্রী সৌদি আরবে আটকা পড়েছেন।
তিনি জানান, আটকা পড়া যাত্রীদের হোটেল এবং ফ্লাইটের বাড়তি খরচের বোঝা কমাতে সরকার সৌদি কর্তৃপক্ষ এবং এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে। এছাড়া নিরাপত্তার খাতিরে আরও প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে তাদের ওমরাহ যাত্রা এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিত করার অনুরোধ জানিয়েছে সরকার।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইচসান মার্শা একে একটি জরুরি মানবিক ও লজিস্টিক সমস্যা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আর্থিক ও মানসিক ধকল
সৌদি আরবে আটকা পড়া জানিরাহ ফারিস নামের এক ওমরাহযাত্রী ইন্দোনেশিয়ার আইনিউজ টিভিকে জানান, তার ফেরার ফ্লাইটটি বাতিল করা হয়েছে এবং তার নতুন ফ্লাইট আগামী ১২ মার্চ পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। আটকা পড়া যাত্রী, বিশেষ করে যাদের এই বিলম্বের কারণে বাড়তি খরচ বহনের সামর্থ্য নেই, তাদের সাহায্য করার জন্য ইন্দোনেশিয়া সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
জানিরাহ বলেন, সবার পক্ষে হোটেলে অতিরিক্ত থাকার খরচ মেটানো সম্ভব নয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মানসিক যন্ত্রণা। আমি খুব হতাশ, কারণ আমার সন্তানরা আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়া থেকে প্রতি বছর, বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে লাখ লাখ মানুষ ওমরাহ করতে সৌদি আরব যান।
জেদ্দায় মালয়েশিয়ার কনসাল জেনারেল মোহাম্মদ জারাইফ রাজা আব্দুল কাদির গত মঙ্গলবার দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থা বারনামাকে জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ার প্রায় ১ হাজার ৬০০ ওমরাহযাত্রী সৌদি আরবে আটকা পড়েছেন। তিনি জানান, যাত্রীরা ভালো আছেন। তার কার্যালয় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের সহায়তা দেওয়ার জন্য একটি ২৪ ঘণ্টার অপারেশন রুম খুলেছে।
রবিবার পর্যন্ত সৌদি আরবের জেদ্দা এবং মদিনা থেকে অস্থায়ীভাবে যাত্রী ফেরত পরিষেবা পুনরায় চালু করার ঘোষণা দিয়েছে মালয়েশিয়া এয়ারলাইনস।
এদিকে, মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা আটকা পড়া নাগরিক ও ওমরাহযাত্রীদের সরিয়ে নিতে কূটনৈতিক মিশন, আঞ্চলিক সরকার এবং এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে কাজ করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিমানবন্দরগুলো ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়ার যাত্রীদের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ হাব হিসেবে কাজ করে যা বর্তমানে এই যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত।
আকস্মিক পরিবর্তন ও পরিবারের পুনর্মিলন
৪৪ বছর বয়সী মিসরের নাগরিক মাগেদ খোলাইফ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি (যেদিন যুদ্ধ শুরু হয়) সৌদি আরব থেকে কুয়েতে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু তার ফ্লাইট বাতিল হয়ে কয়েক দিন পিছিয়ে যায়।
তিনি বলেন, ওমরাহর আধ্যাত্মিক ও আনন্দময় পরিবেশ থেকে এটি ছিল এক আকস্মিক ও নেতিবাচক পরিবর্তন।
স্ত্রী ও শাশুড়িসহ আটকা পড়া খোলাইফ কুয়েতে থাকা সন্তানদের কাছে ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। কুয়েত থেকে পরিচিতদের কাছ থেকে তিনি শুনেছেন, সেখানে সাইরেন এবং বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। খোলাইফ বলেন, ‘সবাই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল।’
পরে তিনি সড়কপথে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর মঙ্গলবার কুয়েতে পৌঁছালে পরিবারের সঙ্গে এক আবেগঘন পুনর্মিলন ঘটে তার। তিনি বলেন, ‘সন্তানদের চোখের সামনে দেখা এবং বুকে জড়িয়ে ধরার পর যতক্ষণ আমরা একসঙ্গে আছি, আর কী ঘটবে তা নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা থাকে না।’
কঠিন সিদ্ধান্ত ও সফর বাতিল
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের বাসিন্দা ৪৭ বছর বয়সী জাভেদ খিজের জানান, তিনি তার পরিবারের ওমরাহ সফর বাতিল করেছেন। তুরস্ক ও কাতার হয়ে সৌদি আরব যাওয়ার কথা ছিল তাদের।
তিনি বলেন, আমরা খবর দেখে বুঝতে পারছিলাম যে পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। সিদ্ধান্তটি (সফর বাতিল) কঠিন ছিল। কে জানে আগামী রমজানে আমি বেঁচে থাকব কি না? কোনো নিশ্চয়তা নেই।
ধর্মীয় আচারে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা
যুক্তরাষ্ট্র থেকে সপরিবারে ওমরাহ করতে আসা ৫২ বছর বয়সী মজিদ মুঘল বলেন, আমরা পবিত্র ভূমিতে (সৌদি আরব) আসাকে আল্লাহর ডাক হিসেবে গণ্য করি। রমজান মাসে আসাটা অনেক সওয়াবের কাজ। তবে যুদ্ধ শুরু হবে জানলে আসতেন না বলে জানান তিনি।
মুঘল জানান, সৌদি আরবে আসার পথে তারা হামলার খবর পান। অন্য রুটের অনেক যাত্রী বিমানবন্দরে আটকা পড়লেও তাদের ফ্লাইটটি স্বাভাবিকভাবেই অবতরণ করেছে।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত সবকিছু ঠিক আছে, আলহামদুলিল্লাহ। এখানে কোনো সমস্যা নেই। রমজানের কারণে প্রচুর ভিড়, তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও স্বাভাবিক দেখছি এবং আমরা অনিরাপদ বোধ করছি না।
এই পরিবারটি যুদ্ধের কথা ভুলে এখন রোজা, নামাজ এবং ধর্মীয় আচারে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে খবর থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে তাদের জন্য। দেশে থাকা আত্মীয়স্বজনদের বারবার আশ্বস্ত করতে হচ্ছে যে, তারা ভালো আছেন।
সবশেষে তাদের মনে বাড়ি ফেরা নিয়ে উদ্বেগ কাজ করছে। মুঘল বলেন, ফ্লাইটগুলো চালু আছে কি না, নিশ্চিত হতে আমরা প্রতিদিন ফ্লাইটের খুঁটিনাটি যাচাই করছি। আমার সন্তানদের স্কুলে ফিরতে হবে; আমাকেও কর্মস্থলে যোগ দিতে হবে।
৩ ঘণ্টা আগে