ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) শিক্ষক নিয়োগে পরিচালকের মেয়েকে সুবিধা দিতে যোগ্যতা শিথিল করার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, আইবিএর বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক ড. আবু ইউসুফ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর মেয়েকে নিয়োগ দিতে প্রভাষক পদে আবেদনের যোগ্যতার শর্ত কৌশলে শিথিল করে প্রশাসনের কাছে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।
‘ইন্টিগ্রেটেড রুলস অ্যান্ড কোয়ালিফিকেশনস ফর অ্যাডভারটাইসড টিচিং পজিশনস’ অনুযায়ী, প্রভাষক পদে আবেদনের জন্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তর—উভয় পর্যায়ে ন্যূনতম সিজিপিএ ৩.৫০ (৪.০০ এর মধ্যে) অথবা প্রথম শ্রেণি থাকতে হবে। গত ১৩ মে আইবিএর প্রভাষকের ৭টি শূন্য পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি সেই নিয়ম মেনেই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, বিজ্ঞপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে আইবিএর পরিচালকের মেয়ে নূর জাহান আব্দুল্লাহ আবেদন করেন। তিনি ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল) থেকে ‘সেকেন্ড ক্লাস অনার্স (আপার ডিভিশন)’ ফলাফল নিয়ে ইতিহাস, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বিএ (স্নাতক) সম্পন্ন করেছেন। তাই ঢাবির নীতিমালা অনুযায়ী আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা শর্ত তিনি পূরণ করতে পারেননি।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ১৩ মে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে আবেদনকারীদের নাম ও যোগ্যতা উল্লেখ করে আইবিএ পরিচালক একটি তালিকা উপ-উপাচার্যের (শিক্ষা) কাছে পাঠান। তবে কারা বিজ্ঞাপনের শর্ত পূরণ করেছেন এবং কারা করেননি, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট মন্তব্য না থাকায় উপ-উপাচার্য সেটি ফেরত পাঠান। পরে পরিচালক সেপ্টেম্বরে আরেকটি তালিকা উপ-উপাচার্যের দপ্তরে পাঠান। এখন পর্যন্ত এ প্রক্রিয়ায় আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এর মাঝেই অভিযোগ ওঠে, বিজ্ঞপ্তির শর্তের কারণে পরিচালকের মেয়ে বাদ পড়ার আশঙ্কায় আইবিএ থেকে গত ১০ সেপ্টেম্বর প্রভাষকের দুটি পদে নিয়োগের জন্য নতুন চাহিদাপত্র কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়।
আরও অভিযোগ পাওয়া যায়, পরিচালকের মেয়েকে সুযোগ দিতে নতুন চাহিদাপত্রে যোগ্যতার মাপকাঠি পরিবর্তন করে ‘সিজিপিএ ৩.৫০ অথবা প্রথম শ্রেণি অথবা ৬৫ শতাংশের বেশি নম্বর’ লেখা হয়েছে, যা সম্পূর্ণভাবে পরিচালকের মেয়ের স্নাতকে পাওয়া নম্বরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নতুন এই শর্তটি আগের বিজ্ঞপ্তিতে ছিল না এবং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালার পরিপন্থি।
এছাড়া চাহিদাপত্রে বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতাও এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা পরিচালকের মেয়ের ডিগ্রির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
১৩ মে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি ‘অর্থনীতি’ চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু নতুন চাহিদাপত্রে নির্দিষ্ট করে অর্থনীতি, বিজনেস অ্যানালিটিক্স, বিজনেস ল ও এন্টারপ্রেনারশিপ চাওয়া হয়েছে। নূর জাহানের স্নাতক অর্থনীতিতে ও স্নাতকোত্তর এন্টারপ্রেনারশিপে হওয়ায় নতুন চাহিদাপত্রটি মূলত তাকে নিয়োগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মূলত নিয়োগের শর্ত ও মানদণ্ড ঠিক করে ইনস্টিটিউশনের ‘কো-অর্ডিনেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিএন্ডডি)’ কমিটি। জ্যেষ্ঠতম এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষকের সমন্বয়ে কমিটিটি গঠন করা হয়, যার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পরিচালক।
নতুন এই চাহিদাপত্রের শর্তের বিষয়ে আইবিএর একটি সূত্র জানায়, ‘চাহিদা অনুযায়ী সিঅ্যান্ডডি এটা অনুমোদন দিয়েছে, বাকিটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ইচ্ছা।’ ফলে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অনুমোদন পেলেই চূড়ান্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হবে।
এদিকে রেজিস্ট্রার ভবনের আরেকটি সূত্র জানায়, সেপ্টেম্বরে পাঠানো নতুন শর্তযুক্ত চাহিদাপত্রটি অনুমোদনের জন্য উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) বরাবর পাঠানো হয়েছিল। তিনি নিজস্ব কোনো মতামত না দিয়ে সেটি সরাসরি উপাচার্যের কাছে পাঠান। কিন্তু উপাচার্য সেখানে উপ-উপাচার্যের কোনো মন্তব্য বা মতামত না দেখে ফাইলটি ফেরত পাঠান। ফাইলটি বর্তমানে সেখানেই আটকে আছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে তিন দিন চেষ্টা করেও আইবিএ পরিচালক অধ্যাপক ড. আবু ইউসুফ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা যায়নি। তার মুঠোফোনে বার্তা পাঠালে তিনি অসুস্থ বলে জানান।
পরে পরিচালকের একজন সহকারী প্রতিবেদককে ফোন করে বনানীতে তার ব্যক্তিগত অফিসে গিয়ে সরাসরি কথা বলতে বলেন। প্রতিবেদক সেখানে গিয়েও আইবিএ পরিচালকের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। তিনি অসুস্থ বলে তার একজন গবেষণা সহকারী জানান।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বলেন, ‘প্রথমত এটা প্রক্রিয়াধীন। তাই এ বিষয়ে আমার কোনো মতামত নেই। আমরা সাধারণত সিঅ্যান্ডডি কমিটির সুপারিশকে সম্মান করার চেষ্টা করি। যদি এ রকম কিছু হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামও এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি বলেন, ‘এখনও আমার কাছে আসেনি।’