যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মিত্র দেশগুলোকে হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধ জাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের তিনটি বন্দর এলাকা থেকে মানুষকে সরে যেতে বলেছে।
আরব আমিরাতের দুটি বন্দর খালি করার আহ্বান জানিয়েছে ইরান। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো তেহরান প্রকাশ্যে প্রতিবেশী দেশের যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন নয় এমন সম্পদের বিরুদ্ধে হুমকি দিল।
তেহরান অভিযোগ করেছে, ইরানের খার্গ দ্বীপে হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর, ডক ও গোপন আস্তানা ব্যবহার করছে। খার্গ দ্বীপে ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান টার্মিনাল রয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি তেহরান। আরব আমিরাতের যেসব এলাকায় মার্কিন বাহিনী আশ্রয় নিয়েছে, সেসব জায়গা থেকে মানুষকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইরান।
অন্যদিকে, লেবাননে মানবিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে। সেখানে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের বিমান হামলায় ৮০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
আমিরাতের ভূমি ব্যবহার করে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দাবি করেছেন, খার্গ দ্বীপ এবং আবু মুসা দ্বীপে হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি স্থান ব্যবহার করেছে। স্থান দুটির একটি হচ্ছে রাস আল-খাইমাহ এবং আরেকটি দুবাইয়ের খুব কাছাকাছি একটি এলাকা।
এই হামলাকে বিপজ্জনক বলে অভিহিত করে তিনি বলেন, ইরান কোনো জনবহুল এলাকায় আক্রমণ না করার চেষ্টা করবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের এই দাবির বিষয়ে তাদের কোনো মন্তব্য নেই।
অপরদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, তাদের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। তবে, সংযুক্ত আরব আমিরাত এখনো এসব হামলার প্রতিবাদে যুক্তি ও সংযমকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তারা এখনও চলমান সংঘাতে পদক্ষেপ নেওয়ার আগে ধৈর্য ধরছে।
সাম্প্রতিক যুদ্ধের মধ্যে ইরান প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর দিকে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। তবে তারা বলেছে, এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনা। যদিও কিছু ক্ষেত্রে বেসামরিক অবকাঠামো, যেমন: বিমানবন্দর ও তেলক্ষেত্রে আঘাত হানার ঘটনা দেখা গেছে।
এদিকে আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি কেবল তেহরান ও তাদের মিত্রদের জন্যই বন্ধ থাকবে যারা ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালাচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান ট্রাম্পের
স্থানীয় সময় শনিবার (১৪ মার্চ) ট্রাম্প বলেন, বিশ্বজুড়ে তেলের দাম ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকায় তিনি আশা করছেন যে চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশ হরমুজ প্রণালিকে খোলা ও নিরাপদ রাখতে সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে। এর জবাবে ব্রিটেন জানিয়েছে, নৌযান চলাচল নিরাপদ রাখতে তারা মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছে।
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে আরাঘচি প্রতিবেশী দেশগুলোকে বিদেশি আগ্রাসনকারীদের তাদের দেশ থেকে বের করে দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ট্রাম্পের ওই আহ্বানকে ‘ভিক্ষা চাওয়া’ বলে অভিহিত করেছেন।
শনিবার ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড আবারও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যদি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের তেল অবকাঠামোর ওপর হামলা হয়, তবে তারা ওইসব অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট জ্বালানি ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে হামলা চালাতে দুবার ভাববে না।
ইরানের সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, খার্গ দ্বীপে হওয়া হামলায় তেল অবকাঠামোর কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে তাদের দাবি, এই হামলাগুলো একটি বিমান প্রতিরক্ষা স্থাপনা, একটি নৌঘাঁটি, বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার এবং একটি অফশোর তেল কোম্পানির হেলিকপ্টার হ্যাঙ্গারকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছিল।
সামরিক বিমান দুর্ঘটনায় ৬ জন মার্কিন সেনা নিহত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ইরানের বিরুদ্ধে চালানো অভিযানে সহায়তা করার সময় যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এতে বিমানে থাকা ৬ জন সেনা নিহত হন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নিহতরা হলেন— মেজর জন এ ক্লিনার (৩৩), ক্যাপ্টেন আরিয়ানা জি সাভিনো (৩১), টেক সার্জেন্ট অ্যাশলি বি প্রুইট (৩৪), ক্যাপ্টেন সেথ আর কোভাল (৩৮), ক্যাপ্টেন কার্টিস জে অ্যাংস্ট (৩০) এবং টেক সার্জেন্ট টাইলার এইচ সিমন্স (২৮)।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম ইরাকে দুই বিমানের এক অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার পর এই বিধ্বস্তের ঘটনা ঘটে। অবশ্য ‘মিত্রশক্তির নিয়ন্ত্রিত’ আকাশসীমায় ঘটা এই দুর্ঘটনায় অন্য বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করতে সক্ষম হয়েছে।
বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে আরেকটি হামলা
এদিকে, শনিবার বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস কমপ্লেক্সের ভেতরে হেলিপ্যাডে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এই হামলার দায় তাৎক্ষণিকভাবে কেউ স্বীকার করেনি।
ওই দূতাবাস কমপ্লেক্সটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরেই এই স্থাপনাটি ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের ছোড়া রকেট ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে আসছে।
এ ঘটনার পরপর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আবারও ইরাকে থাকা মার্কিন নাগরিকদের তাৎক্ষণিকভাবে দেশটি ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে। বাণিজ্যিক ফ্লাইট না থাকায় তাদের স্থলপথে ইরাক ছাড়তে বলা হয়েছে।
তারা সতর্ক করে জানিয়েছে, ইরান এবং ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, স্বার্থ ও অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রাখবে।