ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টারবিহীন প্রচারণায় ভাটা পড়েছে সুনামগঞ্জের নির্বাচনি আমেজ। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ উঠান বৈঠক ও জনসভায় নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন প্রার্থীরা।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জেলার পাঁচটি আসনে মোট ২০ লাখ ৮০ হাজার ৩৩৫ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। সবকটি আসনে আওয়ামী ঘরানার ভোট পার্থক্য গড়ে দিতে পারে বলে ধারণা অনেকের।
নির্বাচনি মাঠ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সুনামগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে সুনামগঞ্জ-১, ২ ও ৫ আসনে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে দ্বিমুখী লড়াই এবং সুনামগঞ্জ-৩ ও ৪ আসনে বিএনপি, জামায়াত জোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থদের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিএনপি প্রার্থীরা জামায়াত ও স্বতন্ত্রে ধরাশায়ী হতে পারেন বলেও মন্তব্য করেছেন স্থানীয় ভোটারদের অনেকে।
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের বাসিন্দা মো. বখতিয়ার বলেন, সুনামগঞ্জ-৪ আসনে ধানের শীষ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। এ আসনে জামায়াত প্রার্থী তেমন সুবিধা করতে পারবে না। তবে সুনামগঞ্জ-২ আসনে জামায়াত প্রার্থী শিশির মনিরের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।
সুনামগঞ্জ–১
৫ লাখ ১ হাজার ৫৩০ ভোটারের সুনামগঞ্জ-১ (জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা ও মধ্যনগর) আসনে বিএনপি থেকে কামরুজ্জামান কামরুল (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা তোফায়েল আহমদ (দাঁড়িপাল্লা) এবং নেজামে ইসলাম থেকে মাওলানা মুজাম্মিল হক (বই) নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন।
ভোটারদের ধারণা, এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। এই আসনে আনিসুল হক প্রথমে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পেলেও শেষদিকে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে বিএনপি থেকে চূড়ান্ত মনোনয়ন পান কামরুজ্জামান কামরুল। বিএনপির সব বলয়ের মধ্যে চলমান ঐক্য বজায় থাকলে ধানের শীষের প্রার্থী ভালো ব্যবধানে বিজয়ী হবে প্রত্যাশা কর্মী-সমর্থকদের।
জামালগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অর্ধেন্দু ঘোষ চৌধুরী বলেন, ব্যক্তি কামরুলের প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকলেও এখানে ফ্যাক্টর জামায়াত প্রার্থী। সুশৃঙ্খল দল হিসেবে জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতা তেমন না। তবে তাদের ভোট বাড়ছে, এমনটা শোনা যাচ্ছে। দলমত নির্বিশেষে সকলের সমর্থনে কামরুলই এগিয়ে থাকবে আশা করছি।
বিএনপি প্রার্থী কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ভোটের মাঠে আমি কোনো প্রার্থীকেই ছোট হিসেবে দেখছি না। আমাদের উভয় বলয়ের ঐক্য অটুট আছে। আমার বিশ্বাস, এই ঐক্যবদ্ধ বিএনপি ধানের শীষের বিজয় সুনিশ্চিত করবে।
সুনামগঞ্জ-২
সুনামগঞ্জের হেভিওয়েট আসন সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা)-এ ৩ লাখ ৬ হাজার ৪৮ ভোটার রয়েছেন। আসনটিতে বিএনপির বর্ষীয়ান রাজনীতিক ও সাবেক সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে আইনজীবী শিশির মনির ও বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির নিরঞ্জন দাস (কাস্তে) নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এখানে নাছির চৌধুরী ও শিশির মনিরের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে নাছির চৌধুরীই বিজয়ী হতে পারে বলে ধারণা অনেকের।
শাল্লা উপজেলার সুখলাইন গ্রামের এক ভোটার জানিয়েছেন, নাছির-শিশির দুজনেরই অবস্থান ভালো। প্রবীণ হিসেবে নাছির চৌধুরী খানিকটা এগিয়ে রয়েছেন। তবে কম সময়ের মধ্যে শিশির মনিরও ভোটের মাঠে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন।
সুনামগঞ্জ-৩
প্রবাসী-অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ) আসনে সংসদ সদস্য প্রার্থী রয়েছেন ৭ জন। এর মধ্যে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কয়ছর এম আহমদ ছাড়াও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে ১১ দলীয় জোট (উন্মুক্ত) প্রার্থী শাহীনুর পাশা চৌধুরী ‘রিকশা’, বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ার হোসেন ‘তালা’ ও আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির প্রার্থী সৈয়দ তালহা আলম ‘ঈগল’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
৩ লাখ ৭৩ হাজার ১৬ ভোটারের এই আসনে বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিতরা স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ার হোসেনকে সমর্থন দেওয়ায় বেকায়দায় পড়তে পারেন ‘ধানের শীষ’ প্রার্থী। অনেকে আবার মনে করছেন, বিএনপির অনৈক্যের সুযোগে কপাল খুলতে পারে জোটপ্রার্থী শাহীনুর পাশার।
সুনামগঞ্জ-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ার হোসেন বলেন, জনসমর্থনে আমি এখন পর্যন্ত প্রথম সারিতে আছি। দলের মনোনয়নবঞ্চিত বলয়ও আমার পাশে আছে। প্রতিপক্ষ আমার কর্মী-সমর্থক ও ভোটারদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। তবুও বিজয় আমারই হবে।
সুনামগঞ্জ-৪
৩ লাখ ৭২ হাজার ১৮৫ ভোটারের সুনামগঞ্জ-৪ (সদর-বিশ্বম্ভরপুর) আসনে ধানের ‘শীষ প্রার্থী’ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম নূরুল। মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন হাছন রাজার বংশধর দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন (মোটরসাইকেল)। বিএনপির বহিষ্কৃত এই নেতার আছে নিজস্ব ভোটব্যাংক।
এছাড়া নির্বাচনে আছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. শামছ উদ্দিন (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির প্রার্থী নাজমুল হুদা (লাঙ্গল) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শহীদুল ইসলাম (হাতপাখা)।
বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় ‘ধানের শীষ’ প্রার্থী নূরুল ইসলামের বিজয় অর্জনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হতে পারে ধারণা অনেকের।
সুনামগঞ্জ-৫
সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক ও দোয়ারা) আসনে ভোটার ৫ লাখ ২৭ হাজার ৪৫৬ জন। এ আসনে ‘ধানের শীষ’ প্রার্থী কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী বিএনপির হাইকমান্ডের নির্দেশে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় মিলন-মিজানের ঐক্যবদ্ধ প্রচারণায় জমে উঠেছে নির্বাচনি প্রতিযোগিতা।
তবে বসে নেই ১০ দলীয় জোট সমর্থিত জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী আব্দুস সালাম আল মাদানীও (দাঁড়িপাল্লা)। এছাড়া খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল কাদির ‘দেওয়াল ঘড়ি’, জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ‘লাঙ্গল’ এবং ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) প্রার্থী মো. আজিজুল হক ‘আম’ প্রতীকে প্রচারণায় থাকলেও মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে বলে ধারণা করছেন আসনটির অনেক ভোটার।
ছাতক পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জসীম উদ্দিন সুমেন বলেন, মিলন-মিজান সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ প্রচারণা জয়ের ভীত আরও শক্তিশালী করেছে। এখানে ‘ধানের শীষ’ বিপুল ব্যবধানে জয়ী হবে।