আকাশ থেকে ভারী বৃষ্টির ফোঁটা পড়লেই জলাবদ্ধতা থেকে রেহাই মিলছে না খুলনা নগরবাসীর। খুলনায় ভারী বৃষ্টির কারণে মহানগরীর বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও নিম্নাঞ্চল ডুবে যাচ্ছে। ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর কোথাও হাঁটুজল, কোথাও কোথাও তারও বেশি।
টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় কর্মব্যস্ত নগরবাসী, স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী, রিকশা ও ইজিবাইকচালকসহ সর্বস্তরের মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। ভুক্তভোগীসহ সচেতন মহল খুলনার জলাবদ্ধতা নিরসনে ৮২৩ কোটি টাকার প্রকল্প ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়েছেন— ‘এই জলাবদ্ধতা হতে তারা স্থায়ী সমাধান পাবেন কবে?’
খুলনা আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, খুলনায় ৫১ ঘণ্টায় মোট বৃষ্টিপাত হয়েছে ১৮৪ মিলিমিটার। যেহেতু বর্ষাকাল চলছে, এ সময় স্বাভাবিকভাবেই বৃষ্টিপাত হয়। সারা দেশের মতো খুলনায়ও ভারী বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে।
ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে খুলনা শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা ডুবে গেছে। তবে সচেতন মহল বলছে, বর্ষাকালে বৃষ্টি হবে এটা স্বাভাবিক, কিন্তু পরিকল্পিত ও উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকার কারণে খুলনায় সামান্য বৃষ্টিতেও জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জলাবদ্ধতা নিরসনে ৮২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের আওতায় গত সাড়ে পাঁচ বছরে সাতটি খাল খনন ও দুই শতাধিক ড্রেন নির্মাণ-সংস্কার করা হলেও মিলছে না সমাধান।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নগরীর সামগ্রিক জলপ্রবাহ, খালের ধারণক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ নগরায়ণের বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়নি। পর্যাপ্ত গবেষণা ও সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে অনেক স্থানে বড় প্রাকৃতিক খাল সংকুচিত হয়ে ড্রেনে পরিণত হয়েছে।
খুলনা নগরীর মুজগুন্নি এলাকার অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। এছাড়া রয়্যাল মোড়, টুটপাড়া, জিন্নাহনগর, দৌলতপুর, আটরা, গিলাতলা, দিলখোলা, বানরগাতি ও শেখপাড়া এলাকা পানিতে নিমজ্জিত। অনেকের ঘরেও ঢুকেছে পানি।
মুজগুন্নি এলাকার ব্যবসায়ী মোস্তফা জানান, সামান্য বৃষ্টি হলেই আমাদের এই মোড়টিতে হাঁটুজল জমে। জলাবদ্ধতায় চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়ে। গত দুদিনের বৃষ্টিতেই এখানে হাঁটুজল জমেছে। এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণের জন্য কেসিসির হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
পাবলা কারিগরপাড়া এলাকার বাসিন্দা হামিম জানান, একটু বৃষ্টি হলেই বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। যতবার বৃষ্টি হচ্ছে, ততবারই আমাদের বাড়ির নিচতলায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। আগেও বৃষ্টি হলে দুর্ভোগে পড়তাম, কিন্তু এক দিনে পানি সরে যেত; এখন বিপদ হয়েছে অন্য রকম, আমাদের এলাকায় পানি বের হওয়ার কোনো পথ নেই।
তিনি জানান, প্রায় এক বছর আগে কবীর বটতলা থেকে কারিগরপাড়া পর্যন্ত আমাদের এলাকার সড়ক ও পাশের ড্রেন প্রায় তিন ফুট উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু বাড়িঘর থেকে ওই ড্রেনে বৃষ্টির পানি যাওয়ার কোনো কার্যকর সংযোগ রাখা হয়নি। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই বাড়ির উঠান ও নিচতলা পানিতে তলিয়ে যায়।
পাবলা সাহাপাড়া এলাকার বাসিন্দা অনুপ কুমার জানান, খুলনার জলাবদ্ধতার মূল কারণ শুধু অপর্যাপ্ত ড্রেন নয়, এটি একটি পরিকল্পনাগত সংকট। গত কয়েক বছরে অনেক প্রাকৃতিক খাল সংকুচিত করে কংক্রিটের ড্রেনে রূপান্তর করা হয়েছে। এতে পানির ধারণক্ষমতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ দুটোই কমে গেছে। একই সঙ্গে নদী-খালের সঙ্গে শহরের নিষ্কাশন ব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা যায়নি।
তিনি বলেন, শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ করে টাকার অপচয় করলে হবে না, প্রাকৃতিক খালের ধারণক্ষমতা ফিরিয়ে আনা, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার, আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু ও নদী-খালের সঙ্গে নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা না গেলে খুলনার জলাবদ্ধতা থেকে স্থায়ী মুক্তি মিলবে না।
বাস্তহারা এলাকার বাসিন্দা রাজীব জানান, আকাশ থেকে সামান্য পানি পড়লেই আমাদের এলাকায় হাঁটুজল পানি জমে। গত দুদিনের বর্ষায় গোটা এলাকা তলিয়ে গেছে। ঘরের মধ্যে পানি ঢুকে গেছে। আমরা এই জলাবদ্ধতার একটা স্থায়ী সমাধান চাই।
ইজিবাইকচালক হাফিজ জানান, দুদিন ধরে বর্ষা। ঘরে বসে থাকলে তো আর পেটে ভাত যাবে না। মুজগুন্নি রাস্তায় হাঁটুপানি। অনেকে রাস্তায় জাল ফেলে মাছ ধরছে। একটু বৃষ্টি হলেই সড়কে হাঁটুপানি জমে।
সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের প্রতি প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘কোটি টাকা খরচ করে রাস্তা-ড্রেন বানাচ্ছে, কিন্তু আমাদের দুর্ভোগ কমছে কই?’
খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) সূত্র অনুসারে, নগরীতে মোট ড্রেনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ১৬৫ কিলোমিটার। খুলনা সিটি করপোরেশনের ‘খুলনা শহরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন (১ম পর্যায়)’ শীর্ষক ৮২৩ কোটি টাকার প্রকল্পের আওতায় গত কয়েক বছরে খাল খনন, ড্রেন নির্মাণ ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ হয়েছে।
এই প্রকল্পের পরিচালক কেসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ মাসুদ করিম বলেন, এই প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ব্যাসার্ধের ১৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৬৯টি ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। এর সবগুলোই ঢাকনাযুক্ত ড্রেন।
কেসিসির প্রধান কনজারভেন্সি কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান বলেন, আমরা নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার করছি। গত কয়েক দিনের বৃষ্টির কারণে আমরা আপাতত এই কাজ বন্ধ রেখেছি। কারণ ড্রেন থেকে তোলা নরম কাদা মাটি বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে আবার ড্রেনে চলে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, নতুন নির্মিত ঢাকনাযুক্ত ড্রেন পরিষ্কারের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি বা বিশেষায়িত মেশিন সিটি করপোরেশনের কাছে নেই। ফলে শ্রমিকরা ভারী স্ল্যাব একটা একটা করে খুলে পরিষ্কার করেন। এটা সময়সাপেক্ষ ও শ্রমসাধ্য। অনেক স্থানে আবর্জনা জমে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে চলমান প্রকল্পের আওতায় আধুনিক ময়লা পরিষ্কার করার যন্ত্র কেনার ব্যবস্থা রাখা আছে। যন্ত্র এলে পরিষ্কার করার কাজটা আরও সহজ হবে।
কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, মূলত শহরের পানি রূপসা নদীতে নামত, এখন সেটি নামছে না। বিগত সরকারের সময়ে অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ড্রেনের কাজ সময়মতো শেষ না করা, রূপসার পাম্প হাউজ বন্ধ ও স্লুইস গেটগুলো অকেজো থাকায় নগরীতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি বলেন, জোয়ারের সময় এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই নগরীর রাস্তাগুলো ডুবে যাচ্ছে। ড্রেন আগে যেভাবে ছিল, সেভাবে নেই। ড্রেনগুলোর বেড উঁচু করে ফেলায় বাড়িগুলো নিচু হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে রাস্তা ও বাড়ির মধ্যে পানি প্রবেশ করছে এবং মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা মাত্র তিন মাস দায়িত্ব নিয়েছি। এর মধ্যেই আমরা দিন-রাত এই সংকট নিরসনে কাজ করে যাচ্ছি। পানি নিষ্কাশনের বাধা দূর করছি, ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা হচ্ছে। নগরবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে সব চেষ্টা করছি এবং সমাধানের পথ খুঁজছি।
এ সময় নগরবাসীকে ড্রেনে ময়লা-আবর্জনা না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানের ডাস্টবিনে ফেলার আহ্বান জানান তিনি।