রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক। তাদের মুখের কাছে পাওয়া তরল পদার্থ কোনো রাসায়নিক বা কেমিক্যাল বার্নের কারণে নয়, মরদেহ পচনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় মুখের রং ও চেহারায় এমন পরিবর্তন হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বাবলু কুমার বিশ্বাস।
সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুর ২টা ৪০ মিনিটের দিকে মোবাইল ফোনে ইউএনবিকে এ তথ্য দেন চিকিৎসক বাবলু কুমার বিশ্বাস।
মরদেহগুলো উদ্ধারের পর তাদের মুখের কাছে তরল পদার্থ দেখতে পায় পুলিশ। নিহতদের মুখ ‘বীভৎস’ ছিল বলে জানিয়েছিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ কারণে মরদেহে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল।
গতকাল (রবিবার) বিকেলে রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী বলেছিলেন, ‘নিহতদের মুখগুলো প্রাথমিক অবস্থায় বীভৎস ছিল। মুখের কাছে কিছু তরল পড়ে ছিল। তাতে আমরা প্রাথমিকভাবে অনুমান করেছিলাম যে, কোনো কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়েছে কি না। এটা ফরেনসিক করবেন যে ডাক্তার, তাকে আমরা বলেছি। তাদের বডিতে কোনো কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়েছে কি না। ফরেনসিক রিপোর্ট পেলে ফাইনালি এটা শিউর হতে পারব। শরীরে অন্য কোথায় ছিল না, শুধু সবার মুখগুলো বীভৎস ছিল।’
এ বিষয়ে ডা. বাবলু কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘মৃতদেহ যখন পচে ওঠে, তখন পোশাকের বাইরে অংশগুলো অনেক সময় একটু কালো দেখায়। ওটা কোনো ধরনের কেমিক্যাল বার্ন বা এমন কোনো কিছু ছিল না।’
তিনি বলেন, কালো দেখাচ্ছে এটা ঠিক। এটা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু ওই যে বললাম, এটা ডিকম্পোজিশন প্রসেসে, মানে রক্ত যখন পচে যেতে থাকে, তখন রঙ আস্তে আস্তে এরকম হয়ে যায়। এটা কেবল একটি প্রক্রিয়া আর কি, পচনের একটা প্রক্রিয়া। সাধারণত মরে গেলে তাজা মানুষই দেখি, পচা মানুষ তো আর খুব বেশি দেখা যায় না, যে কারণে যে দেখেনি তার কাছে এমন মনে হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু এমনি কোনো কেমিক্যাল বার্ন-টার্নের চিহ্ন সেখানে নেই।
হত্যার বিষয়ে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বলেন, শ্বাসরোধ করেই হত্যা করা হয়েছে। ধস্তাধস্তির ফলে বিভিন্ন জায়গায় হয়তো একটু আঘাত ছিল। এছাড়া অন্য কিছু নেই।
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন পরিবারের অভিভাবক। স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, ছেলে প্রিয়ম ও মেয়ে আগামীকে নিয়ে ছিল তার সংসার। গত শনিবার রাতে মাছুয়াপাড়ার বাড়ি থেকে তাদের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
স্বজনরা জানান, গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর থেকেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বজনরা শনিবার বাড়িতে গিয়ে চারজনের মরদেহ দেখতে পান। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
সেদিন রাতেই পুলিশ চারটি মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল সন্ধ্যায় মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর রাত সাড়ে ১০টায় নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
গত শনিবার রাতেই প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস (২৩) ও মুগ্ধ দাসকে (১৯) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন আদালত-২-এ তাদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়। এরপর তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় গতকাল রংপুর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। তবে মামলায় কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি। অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে করা মামলায় আসামির সংখ্যাও উল্লেখ করা হয়নি।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গতকাল থেকে রংপুর জেলা স্কুল, কারমাইকেল কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা বিক্ষোভ করছেন। আজও (সোমবার) আন্দোলন চলমান রয়েছে।