ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ সীমান্তের ওপারে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে নিহত বাংলাদেশি যুবক আসাদুল হকের মরদেহ দেশে ফিরেছে। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে বেঁচে যাওয়া আরও দুই বাংলাদেশি মোস্তাকিম ও শ্রী উদাকে ভারতে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ভোরে পীরগঞ্জ উপজেলার চান্দেরহাট সীমান্তের ৩৩৩ নম্বর পিলারের কাছে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত আসাদুল হক (৩৮) পীরগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ ইন্দ্রইল গ্রামের আব্দুল ওয়াজেদের ছেলে। আহত মোস্তাকিম একই উপজেলার উত্তর ইন্দ্রইল গ্রামের আহেদ আলীর ছেলে এবং শ্রী উদা নারায়ণের ছেলে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, শনিবার ভোররাতে কয়েকজন বাংলাদেশি যুবক চান্দেরহাট বিওপির আওতাধীন সীমান্ত দিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। এ সময় ভারতের উত্তর দিনাজপুরের ৬৩ নম্বর চকশিবানন্দ বিএসএফ ক্যাম্পের একটি টহলদল তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।
এতে আসাদুল, মোস্তাকিম ও শ্রী উদা গুলিবিদ্ধ হন। পরে বিএসএফ সদস্যরা তাদের উদ্ধার করে ভারতের উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জ স্টেট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক আসাদুলকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসক জানান, হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
পরে ভারতীয় পুলিশ আসাদুলের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করে। অন্যদিকে চিকিৎসা দেওয়ার পর মোস্তাকিম ও শ্রী উদাকে গ্রেপ্তার করে ভারতীয় পুলিশ।
তাদের বিরুদ্ধে ভারতের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট, ২০২৫-এর ২১ ধারাসহ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার কয়েকটি ধারায় মামলা করা হয়। পরে তাদের রায়গঞ্জ মুখ্য বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে আদালত ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন।
আসাদুলের মরদেহ দেশে ফেরাতে বিজিবি বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগ করে। রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে চান্দেরহাট সীমান্তের শূন্যরেখায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে দিনাজপুর ৪২ বিজিবি এবং ভারতের পক্ষে বিএসএফের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সেখানে আসাদুলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।
পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে রোববার রাত ১০টার দিকে বিএসএফ আসাদুলের মরদেহ বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে।
আসাদুলের স্বজনেরা বলেন, আসাদুল আর কোনোদিন তাদের মাঝে ফিরবেন না—এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। তারা ভেবেছিলেন, আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়ে হয়তো তিনি বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার মরদেহ ফিরেছে। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করেন।
মোস্তাকিমের পরিবারের সদস্যরা বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই তারা দুশ্চিন্তায় আছেন। হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর তাকে ভারতীয় পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে জানতে পেরে তারা আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। মোস্তাকিম বেঁচে আছেন, এটিই এখন তাদের সবচেয়ে বড় স্বস্তি। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তারা।
শ্রী উদার পরিবারের সদস্যরাও তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান। তারা বলেন, গুলিতে আহত হওয়ার পর শ্রী উদা বেঁচে আছেন, কিন্তু এখন ভারতের কারাগারে। পরিবারের সঙ্গে আবার কথা বলতে পারাটাই তাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া।
বৈরচুনা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. শাহাজাহান আলী বলেন, বিএসএফের গুলিতে একজন নিহত হয়েছেন। তার বাড়ি ওই এলাকায়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে তার মৃত্যুর খবর জানার পর বিষয়টি বিজিবিকে জানানো হয়। পরে বিজিবি বিএসএফের সঙ্গে পতাকা বৈঠক করে। রোববার রাতে আসাদুলের মরদেহ দেশে ফেরত আনা হয়েছে। অন্য দুইজনকে ভারতের কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে তিনি জানান।
দিনাজপুর ৪২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ আল মঈন বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে তারা ঘটনাটি জানতে পারেন। নিহতের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা করা হয়। প্রক্রিয়া শেষে রবিবার রাত ১০টার দিকে বিএসএফ আসাদুলের মরদেহ ফেরত দিয়েছে।