সম্প্রতি সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় উদ্বেগের মধ্যে বাংলাদেশ এখনও বিস্তারিত জানার জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে রায়ের অনুলিপি পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে এ বিষয়ে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। তাই দুই দেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও যোগাযোগে সম্ভাব্য ঘাটতির কথা উল্লেখ করে বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় অংশীদার সৌদি আরবের কাছে ব্যাখ্যাও চেয়েছে বাংলাদেশ।
এছাড়া বিদেশে কোনো বাংলাদেশির বিরুদ্ধে ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হলে তাকে কনস্যুলার সহায়তা দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো আগেই বাংলাদেশকে অবহিত করবে বলে প্রত্যাশা করে সরকার।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলার সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ ইসলাম এসব তথ্য জানান।
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকে ‘খুবই হতাশাজনক’ উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে এবং এখানে তথ্য আদান-প্রদান ও যোগাযোগে কেন ঘাটতি হয়েছে, তা জানতে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় অংশীদার সৌদি আরবের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছি। আমরা আলোচনা করছি।
পুরো প্রক্রিয়ার কোনো এক পর্যায়ে ত্রুটি হয়ে থাকতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সরকারের সঙ্গে সৌদি আরবের সুসম্পর্ক ও গভীর বন্ধন রয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
অন্যদিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলার সময় আরেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, এ ঘটনার বিস্তারিত জানার জন্য তারা এখনও রায়ের অনুলিপি পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
তিনি বলেন, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে রায়ের অনুলিপি পাওয়া পর্যন্ত দয়া করে অপেক্ষা করুন। এরপর আমরা সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব এবং কী করা যেতে পারে তা খতিয়ে দেখব।
শামা ওবায়েদ বলেন, নিয়মিত বিরতিতে তারা আমাদের একটি তালিকা দেয়। ওই তালিকার মাধ্যমে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে পারি, কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং কখন করা হয়েছে। তালিকায় তাদের নাম রয়েছে কি না, তা আমরা যাচাই করছি।
প্রতিমন্ত্রী জানান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে সরকার এখনও বিস্তারিত তথ্য পায়নি। এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আরও তথ্য চাওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে অতিরিক্ত কোনো তথ্য নেই। আমরা তাদের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছি। তারা তা দিলে পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
বিদেশে কোনো বাংলাদেশির মৃত্যু হলে সরকার তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
২০২৩ সালে সৌদি আরবে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে নিহত এক বাংলাদেশির দুই সন্তানের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করেছিল সরকার। সোমবার পরিবারটি সেই ক্ষতিপূরণ পেয়েছে।
তিনি আরও বলেন, একেক দেশের আইনি প্রক্রিয়া একেক রকম। সৌদি আরবেরও নিজস্ব আইনি কাঠামো রয়েছে।
হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশে কোনো সৌদি নাগরিককে ফৌজদারি অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হলে দেশটির কর্তৃপক্ষকে তা জানানো হবে, যাতে তারা ওই নাগরিককে কনস্যুলার সহায়তা দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অন্তত তাদের জানা উচিত, তাদের একজন নাগরিক বাংলাদেশের মাটিতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। বাংলাদেশও সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশের কাছ থেকে একই ধরনের যোগাযোগ প্রত্যাশা করে, যাতে দেশগুলোতে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের সহায়তা করা যায়।
সৌদি আরবের নিজস্ব আইন রয়েছে এবং দেশটিতে ভ্রমণকারী সবাইকে সেই আইন মেনে চলতে হয় উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, ধর্মীয় উদ্দেশ্যে মানুষ যে পবিত্র স্থানে যান, সেখানে কারও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ানো গ্রহণযোগ্য নয়।
সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা
এর আগে রবিবার ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর বিন আবিয়ার সঙ্গে আলোচনার সময় এ বিষয়ে আরও তথ্য চায় ঢাকা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব ও পশ্চিম) ড. মু. নজরুল ইসলাম সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছেন বলে ইউএনবিকে জানান মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
তবে সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকটি তাকে তলবের অংশ ছিল না বলে ইউএনবিকে জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা।
সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছে বিষয়টি তুললেও দুই দেশের শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এ ঘটনার কোনো প্রভাব পড়বে না বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে ঢাকা।
আলোচনায় স্বাগতিক দেশের আইন সম্পর্কে ‘সচেতন’ থাকার গুরুত্বও তুলে ধরা হয়।
এছাড়া বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার ধারাবাহিক অগ্রগতিতে উভয় পক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
সম্প্রতি সৌদি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, পবিত্র নগরী মক্কার একটি মসজিদে ‘অশালীন কর্মকাণ্ডে’ দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি আরব। সৌদি কর্তৃপক্ষ ওই দুই বাংলাদেশির পরিচয় জানিয়েছে নজরুল ইসলাম আবদুল বশির ও সিথি আক্তার হিসেবে।
এ ঘটনা দুর্ভাগ্যজনক ও অপ্রত্যাশিত উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ জানতে পারে, সৌদি আরবের আইনে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং তা কার্যকরও করা হয়েছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনকে আগাম কিছু জানানো হয়নি।
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের সংশ্লিষ্ট দেশের আইনকানুন মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদেশে কাজ করতে যাওয়া বাংলাদেশিদের মনে রাখতে হবে, তাদের সংশ্লিষ্ট দেশের আইন মেনে চলতে হবে। একইভাবে বাংলাদেশে কোনো বিদেশি নাগরিক অপরাধ করলে তাকেও বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিচারের মুখোমুখি হতে হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘এটাও আমাদের জন্য একটা শিক্ষা হতে পারে। তবে এটি অবশ্যই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। এ ধরনের খবর আমরা পেতে চাই না।’
সৌদি সরকারের জবাব পাওয়ার পর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া ও সময় নিয়ে আলোচনা করা যাবে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
বাকু ও বাগদাদে কবিরের কর্মসূচি
অন্যদিকে বিদেশ সফর নিয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, আজারবাইজানের বাকুতে সিআইসিএ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর তিনি ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যোগ দিতে বাগদাদে যান।
তিনি এ সফরকে ফলপ্রসূ উল্লেখ করে বলেন, বৈঠকের ফাঁকে অনুষ্ঠিত আলোচনাগুলোতে আন্তর্জাতিক অংশীজনরা বাংলাদেশের বিষয়ে উল্লেখযোগ্য আগ্রহ দেখিয়েছেন।
ওআইসির বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে এগিয়ে আসতে সদস্য দেশগুলোর প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো আহ্বান জানান তিনি।
এছাড়া রোহিঙ্গাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ে গাম্বিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একটি বিশেষ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন কবির।
তিনি বলেন, আলোচনায় রোহিঙ্গা ইস্যুকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় ওআইসির সদস্য দেশগুলো কীভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হয়।
শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, সফরকালে কোনো নির্দিষ্ট উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো আলোচনা হয়নি।