সহিংসতা ও অস্থিরতায় ভরা মধ্যপ্রাচ্যে একটি দীর্ঘ সময়জুড়ে আরব আমিরাত নিজেদের ‘আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ের একটি নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে প্রচার করে আসছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় শুরু হওয়া যুদ্ধের জেরে ইরানের চক্ষূশূল হওয়ায় ধীরে ধীরে মুখ থুবড়ে পড়ছে দেশটির অর্থনীতি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র আরব আমিরাত যুদ্ধ চলাকালে অন্যান্য যেকোনো দেশের তুলনায় সব থেকে বেশি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। এই হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণ আমিরাতের অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি অর্ধেকেরও বেশি কমিয়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, পর্যটন ও সম্মেলন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পারস্য উপসাগরের ওপারে অবস্থিত ইরানের ঠিক বিপরীত দেশ আরব আমিরাত নিজেদের শক্তিশালী ও অবিচল দেখানোর চেষ্টা করলেও দেশটির অর্থনৈতিক মন্দা ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে। সম্প্রতি তারা হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়াও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে তারা ওপেক তেল কার্টেল থেকে সরে এসেছে। অবশ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই তারা এই পরিকল্পনা করেছিল।
প্রথম থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রত্যক্ষভাবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। তবে আস্তে আস্তে এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ছে আরব আমিরাত। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় যখন যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় সময় রবিবার (১৭ মে) আরব আমিরাতের বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইরান ড্রোন হামলা করে।
তবে এই প্রতিকূল অবস্থা ও সংকটের মধ্যেও দেশটির অর্থনীতি টিকে আছে। চলমান এই সংকট এখনও কর্মসংস্থান হ্রাস বা বৈদেশিক বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বেশি প্রভাব ফেলতে পারেনি। একটি বিশাল পরিমাণে নগদ উদ্বৃত্তের সঞ্চয় দেশটিকে এই সম্ভাব্য মন্দা থেকে অনেকটা বাঁচিয়ে রেখেছে।
তবে এই সংকট যত দীর্ঘ হবে, ততই আমিরাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে। ধীরে ধীরে আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে দেশটি তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে।
বর্তমানে আরব আমিরাতের কর্মকর্তারা ইরানের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমানভাবে জলদস্যুতা এবং এমনকি সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ তুলছেন এবং সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন।
রবিবার (১৭ মে) রাতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘কোনো পরিস্থিতিতেই আমিরাত নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি কোনো প্রকার হুমকি সহ্য করবে না। যেকোনো হুমকি, অভিযোগ বা শত্রুতার জবাব দিতে এটি তার পূর্ণ, সার্বভৌম, বৈধ, কূটনৈতিক ও সামরিক অধিকারের প্রয়োগ করবে আমিরাত।
আমিরাতের শাসক পরিবারও আরও আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করার পরিকল্পনা করছে।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বারাকাহ হামলায় আমিরাত কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এই হামলায় আবুধাবির সুদূর পশ্চিমের মরুভূমিতে অবস্থিত পারমাণবিক কেন্দ্রটিতে তেজস্ক্রিয়তা নির্গমন হয়নি এবং এর কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
আমিরাত মূলত সাতটি স্বৈরতান্ত্রিকভাবে শাসিত শেখ শাসনের একটি ফেডারেশন, যার মধ্যে রয়েছে দুবাই ও আবুধাবি। দেশটির শীর্ষ শাসক সংস্থা হলো ফেডারেল সুপ্রিম কাউন্সিল, যা সাতটি আমিরাতের বংশানুক্রমিক শাসকদের নিয়ে গঠিত। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আবুধাবির শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান ও তার পরিবারের আধিপত্য বেশি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শাসক পরিবারটি গত কয়েক দশক ধরে আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছে, যার মধ্যে রয়েছে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ইয়েমেন যুদ্ধে অংশগ্রহণ। আমিরাত ২০১৩ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিকে ক্ষমতায় আনতে সহায়তা করেছিল। সঙ্গে সঙ্গে সুদান ও লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে বিভিন্ন পক্ষে অস্ত্র পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে দেশটির বিরুদ্ধে। তবে তারা এই অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।
প্রকাশ্যে খুব কম কথা বলা শেখ মোহাম্মদ মার্চ মাসে একটি হাসপাতালে ইরানি হামলায় আহতদের দেখতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে যুদ্ধ নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করেছিলেন।
তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘আমিরাত আকর্ষণীয়, আমিরাত সুন্দর, আমিরাত একটি আদর্শ। কিন্তু আমি তাদের বলব, আমিরাতের চেহারা দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। আমিরাতের চামড়া কিন্তু অত্যন্ত মোটা এবং মাংস তিতা। আমাদের ঘায়েল করা অত সহজ নয়।’
অর্থনৈতিক সতর্কতার লক্ষণ
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া আমিরাতের অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রির ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে, যদিও কয়েকটি ট্যাংকার ওই নৌপথ দিয়ে বের হতে সক্ষম হয়েছে। প্রণালির বাইরে ওমান উপসাগরে অবস্থিত তেল টার্মিনালসহ ফুজাইরাহ শহরে একটি পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১৮ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করা যাচ্ছে। আমিরাত সেই সক্ষমতা দ্বিগুণ করতে দ্বিতীয় পাইপলাইন দ্রুত নির্মাণ করার চেষ্টা করছে।
তবে ইরান যুদ্ধের জেরে আমিরাতের পর্যটন ও সম্মেলন বাজার কঠিন আঘাতের মুখে পড়েছে। এটি দেশটির মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের ১২ শতাংশেরও বেশি বলে ধারণা করা হয়ে থাকে।
কাতারভিত্তিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠান নর্থবোর্ন অ্যাডভাইজরির তথ্য অনুযায়ী, যারা যুদ্ধের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আমিরাতে ৭০টিরও বেশি নির্ধারিত অনুষ্ঠান স্থগিত, বাতিল বা অন্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমিরাত সরকার অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সাধারণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি, তবে আয়োজকরা সম্ভবত ‘বীমা প্রত্যাহার ও দায়বদ্ধতার ঝুঁকির’ কারণে পরিকল্পনাগুলো পরিবর্তন করেছেন।
দুবাইয়ে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের বিষয়ে গত ৪ মে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানসংস্থা এমিরেটস ঘোষণা করে যে তাদের প্রায় সম্পূর্ণ ফ্লাইট সূচি পুনরায় চালু হয়েছে। কিন্তু সেই একই দিন ইরান একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এ ঘটনার পর মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠানো হয় যা আমিরাতে অবস্থানরত দেশে ফিরতে আগ্রহী ব্যবসায়ী সমাজে হাহাকার সৃষ্টি করে।
বিমানবন্দরটি এখন তার জেট জ্বালানি ট্যাংকের চারপাশে একটি প্রতিরক্ষামূলক আবরণ তৈরি করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে সেখানকার কর্মকর্তারা আলোচনা করতে রাজি হননি।
দখলের হার প্রায় ২০ শতাংশে নেমে আসায় দুবাইয়ের আইকনিক বুর্জ আল আরবসহ একাধিক হোটেলের সংস্কার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষক সংস্থা মুডিজ অ্যানালিটিক্স অনুমান করছে, এই হার জুন প্রান্তিকে ১০ শতাংশে নামবে, যা যুদ্ধের আগে ছিল ৮০ শতাংশ।
মুডিজ সতর্ক করেছে যে, দখলের হার সম্ভবত ২০২৬ সালের বাকি সময় আরও নিম্নমুখী থাকবে, কারণ যুদ্ধ থামলেও পর্যটকরা ভ্রমণে দ্বিধাগ্রস্ত থাকবেন।
সোমবার (১৮ মে) প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউটের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দুবাইয়ের উন্মুক্ততা এটিকে ভ্রমণ, লজিস্টিক্স ও আস্থার ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলে, তবে আবুধাবির ব্যালেন্স শিট ও জ্বালানি সম্পদ ফেডারেশনকে আঘাত সামলে নেওয়ার সক্ষমতাও দেয়।
কয়েন-চালিত যুদ্ধবিমানের শিল্পকর্ম
দুবাই বিশেষভাবে দেখানোর চেষ্টা করছে যে দেশটি এখনও সক্রিয়। গত সপ্তাহের শেষে দুবাই তার বার্ষিক আর্ট দুবাই শোয়ের একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ আয়োজন করেছে। সেখানে একটি শিল্পকর্ম ছিল। শিল্পকর্মটি একটি কয়েন-চালিত কালো যুদ্ধবিমান। এটি একটি কালো নাইকি টেনিস জুতা দিয়ে ঢাকা ছিল।
স্পেনের শিল্পী সুলিমান লোপেস একটি ধাতু-সমৃদ্ধ গ্রহাণুর মালিকানা দাবির ধারণাকে কেন্দ্র করে একটি শিল্পকর্ম নিয়ে এসেছিলেন, যেটি নাসার একটি মিশনের লক্ষ্যকে ইঙ্গিত দেয়। দেশ ও কোম্পানিগুলো কীভাবে তেল ও অন্যান্য পণ্য আহরণ করে, শিল্পকর্মটি তার প্রতিফলন ঘটায়।
তবে চলমান এই যুদ্ধাবস্থা লোপেসকে তার শিল্পকর্ম নিয়ে দুবাইয়ে যোগ দেওয়ার বিষয়টি কঠিন করে তুলেছিল। এই শিল্পী বলেন, ‘তবে আমি বললাম, আমাকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে, কারণ আমি সত্যিই বিশ্বাস করি যে এই অঞ্চলে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য এটিই উপযুক্ত জায়গা।’
বৈরুতের শিল্পী আলফ্রেড তারাজি উল্লেখ করেন, তার দাদা-দাদি দুটি বিশ্বযুদ্ধ পার করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বযুদ্ধেও জীবন থেমে থাকে না। আমরা সহিংসতার বিরুদ্ধে সংস্কৃতি দিয়েই লড়াই করব।’