উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই কলম্বিয়ায় একটি সামরিক পরিবহন বিমান বিধ্বস্ত হয়ে অন্তত ৬৬ জন নিহত হয়েছেন। এ দুর্ঘটনায় আরও বহু মানুষ আহত হয়েছেন।
স্থানীয় সময় সোমবার (২৩ মার্চ) দেশটির ছোট শহর পুয়ের্তো লেগিসামোতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ১২৮ আরোহী নিয়ে উড্ডয়ন করেছিল ওই বিমানটি।
পুয়ের্তো লেগিসামো আমাজন অঞ্চলের পুতুমায়ো প্রদেশে অবস্থিত, যা ইকুয়েডর ও পেরুর সীমান্তবর্তী এলাকা।
স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, দুর্ঘটনাস্থল থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে এবং সেনাবাহী একটি ট্রাক ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যাচ্ছে।
কলম্বিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল হুগো আলেহান্দ্রো লোপেজ বারেতো জানান, এখনও চারজন সামরিক সদস্য নিখোঁজ রয়েছেন। তিনি বলেন, দুঃখজনকভাবে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় আমাদের ৬৬ জন সামরিক সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।
বারেতো বলেন, ‘এটি কোনো অবৈধ সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা ছিল কিনা, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা ইঙ্গিত এই মুহূর্তে নেই।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে সহকারী মেয়র কার্লোস ক্লারোস জানান, নিহতদের মরদেহ শহরটির মর্গে নেওয়া হয়েছে। আহতদের প্রথমে স্থানীয় দুটি ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়, পরে তাদের বড় শহরে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনাকবলিতদের সহায়তায় এগিয়ে আসা পুয়ের্তো লেগিসামোর মানুষদের আমি ধন্যবাদ জানাই।’
দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পেদ্রো সানচেস এক্সে দেওয়া বার্তায় জানান, সোমবার বিধ্বস্ত হওয়া বিমানটি পুতুমায়োর আরেক শহরে সেনা সদস্যদের নিয়ে যাচ্ছিল।
বিমানটিতে মোট ১২৮ জন আরোহী ছিলেন, যাদের মধ্যে ১১৫ জন সেনাসদস্য, ১১ জন ক্রু এবং ২ জন জাতীয় পুলিশের সদস্য। বারেতো জানান, দুর্ঘটনার পর ৫৭ জনকে উদ্ধার করে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, স্থানীয় বাসিন্দাদের মোটরসাইকেলে করে আহত সেনাদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অন্যরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করছেন।
কলম্বিয়ার বিমান বাহিনীর কমান্ডার কার্লোস ফের্নান্দো সিলভা বলেন, দুর্ঘটনার বিস্তারিত এখনও জানা যায়নি, তবে বিমানটিতে সমস্যা দেখা দিয়েছিল এবং এটি বিমানবন্দর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে সেটি বিধ্বস্ত হয়।
তিনি আরও জানান, আহতদের রাজধানী বোগোটা ও অন্যান্য স্থানের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য ৭৪ শয্যাবিশিষ্ট দুটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এই দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামরিক সরঞ্জাম আধুনিকায়নের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতার’ কারণে এই প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং এর জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত।
পেত্রোর ভাষ্যে, ‘বেসামরিক বা সামরিক প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যদি দায়িত্ব পালনে সক্ষম না হন, তবে তাদের সরিয়ে দিতে হবে।’
তবে সমালোচকরা দাবি করেছেন, পেত্রো প্রশাসনের অধীনে বাজেট ঘাটতির কারণে সামরিক বিমানগুলোর উড্ডয়ন ঘণ্টা কমে গেছে, যার ফলে ক্রু-দের অভিজ্ঞতার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
কলম্বিয়ার বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ ও সামরিক বিশ্লেষক এরিক সাউমেথ জানান, বিধ্বস্ত হারকিউলিস সি-১৩০ বিমানটি ২০২০ সালে কলম্বিয়াকে অনুদান হিসেবে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তিন বছর পর এতে ‘ওভারহল’ করা হয়, যেখানে ইঞ্জিন পরীক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না, যন্ত্রাংশের ঘাটতির কারণে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে।’ তবে কেন উড্ডয়নের পরই চার ইঞ্জিনবিশিষ্ট বিমানটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ল, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী সানচেসও জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হামলার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি লিখেছেন, ‘এই দুর্ঘটনা দেশের জন্য গভীর বেদনাদায়ক। আমরা আশা করি, আমাদের প্রার্থনা কিছুটা হলেও এই শোক লাঘব করবে।’