যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে নিশ্চিত করা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার বহাল রেখেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রায় সব শিশুই মার্কিন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। এর মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসী-বিরোধী এজেন্ডার একটি প্রধান স্তম্ভ অসাংবিধানিক বলে রায় দিয়েছে আদালত।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিন ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন, যাতে অবৈধভাবে অবস্থানকারী অভিবাসী ও অস্থায়ী বৈধ বাসিন্দাদের যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সন্তানদের স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব না দেওয়ার প্রস্তাব ছিল।
তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকদের পক্ষে রায় লিখতে গিয়ে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস বলেন, এই আদেশ মার্কিন সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর লঙ্ঘন।
রায়ে রবার্টস লেখেন, ‘অতীতে যেমন, এখনও তেমনই নাগরিকত্ব মানে অধিকার ভোগের অধিকার; আমাদের রাজনৈতিক সমাজে স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণের অধিকার। চতুর্দশ সংশোধনীর প্রণেতারা এ দেশের “প্রত্যেক স্বাধীনভাবে জন্ম নেওয়া ব্যক্তির” জন্য সেই প্রতিশ্রুতি সম্প্রসারিত করেছিলেন। আজ আমরা সেই প্রতিশ্রুতিই রক্ষা করছি।’
রবার্টসের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেন উদারপন্থি বিচারপতি সোনিয়া সোটোমেয়র, এলেনা কেগান ও কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসন এবং রক্ষণশীল বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেট।
তবে রক্ষণশীল বিচারপতি ব্রেট ক্যাভানফ রায়ের সঙ্গে একমত হলেও আংশিক ভিন্নমত দিয়ে বলেন, নির্বাহী আদেশটি ফেডারেল আইনের পরিপন্থি হলেও সংবিধান লঙ্ঘন করেনি। এছাড়া অপর তিন রক্ষণশীল বিচারপতি ক্লারেন্স থমাস, স্যামুয়েল আলিটো ও নিল গরসাচ ভিন্নমত দেন।
১৯৪ পৃষ্ঠার রায়ের মধ্যে প্রায় ৯০ পৃষ্ঠাই বিচারপতি থমাসের ভিন্নমত, যা সুপ্রিম কোর্টে তার দায়িত্বকালে সবচেয়ে দীর্ঘ ভিন্নমত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ট্রাম্প এই রায়কে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে তিনি বিষয়টি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জানান।
নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প লেখেন, ‘দীর্ঘ ও জটিল কোনো সাংবিধানিক সংশোধনীর প্রয়োজন নেই। জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের মতো ব্যয়বহুল ও দেশের জন্য অন্যায্য ব্যবস্থা বন্ধে কংগ্রেসের আজই কাজ শুরু করা উচিত। এতে আমার পূর্ণ সমর্থন থাকবে।’
এদিকে, নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো এবং ডেমোক্র্যাটরা এ রায়কে আধুনিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। তারা বলেছে, এ রায়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক সাংবিধানিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত হয়েছে।
মামলাটি পরিচালনা করে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ)। সংগঠনটির জাতীয় আইন বিষয়ক পরিচালক সিসিলিয়া ওয়াং এই রায়কে একটি ‘বড় বিজয়’ হিসেবে উদযাপন করেছেন।
ওয়াং বলেন, ‘আদালতের সিদ্ধান্ত আমেরিকার একটি মৌলিক প্রতিশ্রুতিকে পুনর্ব্যক্ত করেছে—আপনি যদি এখানে জন্ম নেন, তাহলে আপনি একজন নাগরিক। কোনো প্রেসিডেন্ট নির্বাহী আদেশ দিয়ে সংবিধান পরিবর্তন করতে পারেন না।’
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নীতির বিরোধিতা করে আসছেন। দ্বিতীয় মেয়াদে তার অভিবাসন নীতির অন্যতম লক্ষ্য ছিল মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্যতার ব্যাখ্যা নতুনভাবে নির্ধারণ করা।
এর আগে তিনি বারাক ওবামা কেনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তিনি প্রেসিডেন্ট পদের জন্য অযোগ্য—এমন বর্ণবাদী প্রচারণা ছড়িয়েছিলেন। এমনকি কমলা হ্যারিসের জন্মের সময় তার মা-বাবার অভিবাসন মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে তিনি হ্যারিসের ভাইস-প্রেসিডেন্ট এবং পরবর্তীতে হোয়াইট হাউসের যোগ্যতার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন।
তার প্রশাসনের দাবি ছিল, চতুর্দশ সংশোধনীতে ব্যবহৃত ‘subject to the jurisdiction thereof’ বা ‘যুক্তরাষ্ট্রের এখতিয়ারের অধীন’ বাক্যাংশের অর্থ হলো, যেসব শিশুর বাবা-মা বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন না বা কেবল অস্থায়ী বৈধ মর্যাদা নিয়ে আছেন, তারা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাবেন না।
নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছিল, ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে এ নীতি কার্যকর হবে এবং এর ফলে প্রতি বছর জন্ম নেওয়া কয়েক লাখ শিশুর নাগরিকত্বের ওপর প্রভাব পড়বে।
তবে এক বছরের বেশি সময় ধরে আদালতে এ আদেশের বৈধতা নিয়ে শুনানি চলার পর সুপ্রিম কোর্ট চূড়ান্তভাবে জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বা অস্থায়ীভাবে অবস্থানকারী বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম নেওয়া শিশুরাও চতুর্দশ সংশোধনীর নাগরিকত্ব ধারার আওতায় জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন নাগরিক।
ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস বলেছেন, চতুর্দশ সংশোধনী ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসাংবিধানিক আক্রমণ’ প্রতিহত করেছে। অন্যদিকে, প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান স্পিকার মাইক জনসন রায়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিধান ‘অপব্যবহার’ হয়েছে।
সহমতসূচক পৃথক মতামতে বিচারপতি কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসন লেখেন, চতুর্দশ সংশোধনীর ‘সর্বজনীন লক্ষ্য’ বংশপরিচয়কে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ভিত্তি করার যেকোনো দাবির অবসান ঘটানোর জন্যই প্রণীত হয়েছিল।