আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সরকার মামলা প্রত্যাহার করতে পারে না। দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি শাস্তি মওকুফ বা ক্ষমা প্রার্থনা করলে তা আইন ও সংবিধানে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই করতে হবে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে বাগেরহাট-৪ আসনের বিরোধী দলের সদস্য (জামায়াতে ইসলামী) মো. আব্দুল আলীমের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
প্রশ্নে আওয়ামী লীগ সরকারের আমল’ দায়ের হওয়া মামলার রায় প্রত্যাহার বা দণ্ড মওকুফের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চান মো. আব্দুল আলীম। জবাবে আইনমন্ত্রী মামলা প্রত্যাহার ও দণ্ড মওকুফ-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনি বিধান তুলে ধরেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সরকার মামলা প্রত্যাহার করতে পারে না। কোনো মামলায় আপিল বিচারাধীন থাকলে প্রথমে সেই আপিলের নিষ্পত্তি হতে হবে। আপিল নিষ্পত্তির পর ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারার আওতায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে পারবেন। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ে মতামতের জন্য পাঠানো হবে এবং রাষ্ট্রপতি আইন অনুযায়ী সাজার মওকুফ বা ক্ষমার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।’
এ সময় সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদেও রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রেও আবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যাবে এবং আইন মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় মতামত প্রদান করবে। ফলে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মামলা প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ নেই; তবে আইনে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সাজার মওকুফ বা রাষ্ট্রপতির ক্ষমা লাভের সুযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক মামলাগুলো প্রত্যাহারের জন্য জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির সুপারিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন আরেকটি কমিটির কাছে আসে। সেখানে প্রতিটি মামলা আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে যাচাই-বাছাই করে প্রত্যাহারের বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, সরকার রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলাগুলোর বিষয়ে আইনসম্মত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে, যাতে প্রকৃত রাজনৈতিক মামলাগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
আদালতে ৪৬,৩৯,৪৭৬টি মামলা বিচারাধীন
দেশে কত মামলা এখন বিচারাধীন রয়েছে—যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রছুলের এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, দেশের আদালতগুলোয় বর্তমানে ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ১৮ লাখ ১৩ হাজার ২৬৩টি দেওয়ানি এবং ২৮ লাখ ২৬ হাজার ২১৩টি ফৌজদারি। এক বছরে উচ্চ আদালতে ৬৩ হাজার ৩০৯টি এবং অধস্তন আদালতে দুই লাখ ৭৫ হাজার ৮৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
তিনি জানান, গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ২১ হাজার ৬৫২টি দেওয়ানি ও ১৭ হাজার ৬১টি ফৌজদারি মামলাসহ মোট ৩৮ হাজার ৭১৩টি মামলা বিচারাধীন ছিল। হাইকোর্ট বিভাগে ১ লাখ ১ হাজার ১৬৮ দেওয়ানি ও ৪ লাখ ২১ হাজার ১৬৩ ফৌজদারি মামলাসহ মোট ৫ লাখ ২২ হাজার ৩৩১ টি মামলা বিচারাধীন। সেই সঙ্গে ২০২৫ সালে আপিল বিভাগে ৭ হাজার ৫৫৩টি এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৫৫ হাজার ৭৫৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত অধস্তন আদালতে ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা বিচারাধীন ছিল, যার মধ্যে দেওয়ানি মামলার সংখ্যা ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৪৩টি এবং ফৌজদারি মামলার সংখ্যা ২৩ লাখ ৮৭ হাজার ৯৮৯টি। গত এক বছরে মোট ২ লাখ ৭৫ হাজার ৮৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, যার মধ্যে দেওয়ানি মামলা ৪৯ হাজার ৭৩টি এবং ফৌজদারি মামলা ২ লাখ ২৬ হাজার ১১টি।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের শাহজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বর্তমানে (গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত) ২১ হাজার ৬৫২টি এবং হাইকোর্ট বিভাগে ১ লাখ ১ হাজার ১৬৮টি দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন। দেশের অধস্তন আদালতে বর্তমানে দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৪৩টি। এ মামলার মধ্যে ৫ বছরের অধিক পুরোনো মামলার সংখ্যা ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৪১৪টি।
ঢাকা-৪ আসনের সৈয়দ জয়নুল আবেদীনের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, বর্তমানে দেশের ২০টি জেলায় বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রম চালু থাকায় ওই জেলাগুলোয় উল্লেখযোগ্যভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি হচ্ছে। এই জেলাগুলোর আদালতে নিয়মিত মামলা দায়ের করার হার ৬২ দশমিক শূন্য ৮৩ শতাংশ কমেছে। এই উদ্যোগ সফল হওয়ায় বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতার আইনি বাধ্যবাধকতা পর্যায়ক্রমে ঢাকাসহ দেশের সব জেলায় কার্যকর হবে।
জামালপুর-৫ আসনের শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুনের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, দেশের আদালতগুলোয় (গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত) ৩ হাজার ৬২৫টি অর্থ ঋণ মামলা বিচারাধীন।
সংরক্ষিত আসনের মাহফুজা হান্নানের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগে ৫ জন, হাইকোর্ট বিভাগ ১০১ জন বিচারপতি কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া অধস্তন আদালতে ২ হাজার ৬২০ জন বিচারকের পদের বিপরীতে ১ হাজার ৯৬৪ জন কর্মরত আছেন।