ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে গুরুতর সংশয় প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেছেন, সরকারের হাতে এখনও ৭ দিন সময় রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তার এবং কালো টাকার দৌরাত্ম্য বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) খুলনা প্রেসক্লাবে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করতে গিয়ে এ শঙ্কার কথা জানান। মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনা-৫ আসন (ডুমরিয়া-ফুলতলা) থেকে জামায়াত মনোনীত ও ১১ দলীয় জোট সমর্থিত ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের সংসদ সদস্য প্রার্থী।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, নির্বাচন কমিশন ও অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারপ্রধানের পক্ষ থেকে অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচনের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতি সেই আশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের এখনও ১ সপ্তাহ বাকি, অথচ এখনই প্রার্থী, কর্মী ও ভোটারদের ওপর হামলা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে জনগণ নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবে না।’
নির্বাচনের পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখার দায়িত্ব সরকার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন কমিশনের। এ বিষয়ে সরকার নির্লিপ্ত থাকলে অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সুযোগ হাতছাড়া হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বক্তব্য ভাইরাল হয়েছে, যেখানে একজন রাজনৈতিক নেতা প্রকাশ্যে বলেছেন, দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট চাইতে গেলে নারীদের পোশাক খুলে নিতে হবে। এটা শুধু রাজনৈতিক সহিংসতা নয়, এটি নারী মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত। যারা ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই এ ধরনের হুমকি দেয়, তারা ক্ষমতায় গেলে কী করবে সেটা ভেবেই আমরা আতঙ্কিত।’
এ সময় সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার অভিযোগ, খুলনা-৫ আসনের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিলে ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও মিটিং করতে গেলে তাদের জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, দাঁড়িপাল্লার সভায় গেলে খবর আছে। অন্যদিকে, কিছু এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাবেক জনপ্রতিনিধিদের জোরপূর্বক বাড়ি থেকে তুলে এনে নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এটা ভোট নয়, জোর করে রাজনৈতিক অবস্থান চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।’
নিজের নির্বাচনি এলাকায় প্রচারণা বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ফুলতলা ও ডুমুরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় তার নির্ধারিত সভা-সমাবেশে পরিকল্পিতভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। একাধিক স্থানে চেয়ার-টেবিল ভেঙে সভা ভন্ডুল করা হয়। একটি এলাকায় গণসংযোগ শেষে নির্ধারিত সভাস্থলে পৌঁছানোর আগেই প্রতিপক্ষের লোকজন গিয়ে চেয়ার সরিয়ে নেয় এবং সভা করতে বাধা দেয়। বিষয়টি থানাকে জানানো হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কাউকে আটক বা আইনি ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনের বড় অংশজুড়ে ছিল কালো টাকা ও ভোট কেনার অভিযোগ। এ বিষয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, খুলনা-৫ আসনে সংগঠিতভাবে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ ঢালছে একটি পক্ষ। উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক কোটা নির্ধারণ করে বাড়ি বাড়ি টাকা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কালো টাকার দাপটে রাজনীতি কলুষিত হচ্ছে। প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে এ জামায়াত নেতা বলেন, প্রত্যেক থানার কাছে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের তালিকা থাকা সত্ত্বেও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কিংবা পরিচিত সহিংসদের গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও আন্তরিকতার অভাব রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে সাইবার হামলার একটি বিস্তারিত অভিযোগও তুলে ধরেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তার দাবি, জামায়াতে ইসলামীর আমিরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট এবং পরবর্তীতে তার নিজের টুইটার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছে।
তিনি জানান, তদন্তে একটি সরকারি দপ্তরের একজন কর্মকর্তার ই-মেইল থেকে ভারতীয় উৎসের ভাইরাস ব্যবহার করে এই হ্যাকিং করা হয়েছে বলে তাদের সাইবার টিম শনাক্ত করেছে। এ ঘটনায় সাইবার আইনে মামলা করা হয়েছে এবং ডিবি পুলিশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ল্যাপটপসহ আটক করেছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ওই কর্মকর্তাকে ছাড়িয়ে নিতে উচ্চপর্যায়ে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত পুলিশ তাকে মুক্তি দিতে পারেনি।