জামালপুরের ইসলামপুরে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলের চালক আবু বকর নূরী হত্যা মামলার রহস্য দীর্ঘ আট বছর পর উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে সংস্থাটি।
গ্রেপ্তাররা হলেন: ইসলামপুর উপজেলার আগুনেরচর গ্রামের আক্তার আলীর ছেলে জালাল মিয়া (৪২), উসমান শেখের ছেলে মো. নূর ইসলাম (৩২) এবং মৃত আছান আলীর ছেলে মো. মোজাম্মেল হক (৪৮)।
সিআইডি জামালপুর ইউনিটের পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান সোমবার (৩১ আগস্ট) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, প্রায় আট বছর ধরে অমীমাংসিত থাকা মামলাটির রহস্য উদঘাটনে সিসিটিভি ফুটেজ, বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত, ফরেনসিক যাচাই এবং বিশেষ গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ধারাবাহিক তদন্ত চালানো হয়। একাধিক অভিযানের পর হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সিআইডি জানায়, গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে দুজন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অপরজন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আজ সোমবার রিমান্ড শুনানি শেষে আদালত জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।
যেভাবে হত্যা করা হয়
প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২ জুলাই দুপুরে আবু বকর নূরী স্ত্রী মোছা. তাহমিনা বেগমের সঙ্গে খাবার খেয়ে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল নিয়ে বকশীগঞ্জ বাজারের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হন। কিন্তু সেদিন রাতে বাড়িতে ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা তার খোঁজ শুরু করেন।
পরে ইসলামপুর থানার চুংরাপাড়া গ্রামের পুবেরবন্দ এলাকায় একটি মরদেহ পড়ে থাকার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান তাহমিনা বেগম। সেখানে তিনি মরদেহটি তার স্বামী আবু বকর নূরীর বলে শনাক্ত করেন।
তদন্তে সিআইডি জানতে পারে, ঘটনার দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত সাড়ে ৮টার মধ্যে সংঘবদ্ধ একটি অপরাধীচক্র মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে পূর্বপরিকল্পিতভাবে নূরীকে কৌশলে ঘটনাস্থলে নিয়ে যায়। পরে তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে মোটরসাইকেলটি নিয়ে পালিয়ে যায় তারা।
এ ঘটনায় নূরীর স্ত্রী বাদী হয়ে ইসলামপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর ইসলামপুর থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করে। পরে অধিকতর তদন্তের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় পুলিশ সদরদপ্তরের নির্দেশে ২০২০ সালের ১৯ আগস্ট মামলাটির তদন্তভার সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়।
সিসিটিভি ফুটেজ থেকে ৫ হাজার পোস্টার
সিআইডি তদন্তভার গ্রহণের পর মামলার বিভিন্ন দিক নতুনভাবে পর্যালোচনা শুরু করে। দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাওয়ায় জড়িতদের শনাক্তে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল বলে জানান তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
তদন্তের একপর্যায়ে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে নূরীর মোটরসাইকেলে থাকা তিন অজ্ঞাত ব্যক্তির ছবি সংগ্রহ করা হয়। তবে ঘটনার দীর্ঘ সময় পর ওই ছবি থেকে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
পরে বিভিন্ন মাধ্যমে ছবিগুলো প্রচার করা হয়। এ জন্য জামালপুরসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থান, হাটবাজার ও জনসমাগমস্থলে প্রায় ৫ হাজার পোস্টার লাগানো হয়। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের ছবি প্রচার করে তথ্যদাতার জন্য এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।
এ প্রচারণার পর বিভিন্ন সূত্র থেকে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। পরে আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সহায়তায় সেসব তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজনদের পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করে সিআইডি।
তদন্তের একপর্যায়ে সিআইডি নিশ্চিত হয় যে জালাল মিয়া, নূর ইসলাম ও মোজাম্মেল হক হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।
তিনজনকে যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়
সিআইডি জানায়, গত ২৬ আগস্ট জামালপুর জেলার ইসলামপুর থানার নাপিতের চর এলাকা থেকে জালাল মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন এবং তার অপর দুই সহযোগী নূর ইসলাম ও মোজাম্মেল হকের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন বলে জানিয়েছে সিআইডি।
জালালের দেওয়া তথ্য এবং তদন্তে পাওয়া অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষ গোয়েন্দা সহায়তা নিয়ে পরদিন ২৭ আগস্ট গাজীপুরের টঙ্গী এলাকা থেকে নূর ইসলাম এবং গাজীপুর কলেজ রোড এলাকা থেকে মোজাম্মেল হককে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা এবং ছিনিয়ে নেওয়া মোটরসাইকেল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে সিআইডি।
গ্রেপ্তার তিনজনকে আদালতে সোপর্দ করার পর তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ছিনিয়ে নেওয়া মোটরসাইকেল উদ্ধার এবং এ ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত থাকলে তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে সিআইডির তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।