দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শ্রমবাজারের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং কৌশলগত সহযোগিতা গভীর করা এই সফরের মূল লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে রবিবার (২১ জুন) বিকেল পৌনে ৩টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে। এ সময় তাদের বিদায় জানান বিএনপির মহাসচিব ও এলজিআরডিমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও মন্ত্রিসভার সদস্যসহ বিএনপির শীর্ষ নেতারা।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সেক্রেটারি আতিকুর রহমান রুমন জানান, প্রধানমন্ত্রী, তার স্ত্রী ড. জুবাইদা রহমান এবং সফরসঙ্গী প্রতিনিধিদলকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইট দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে রওনা হয়।
তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন। এটি একটি দুই দিনের সফর। এরপর মালয়েশিয়া থেকে তিনি চার দিনের সরকারি সফরে চীনে যাবেন।’
সফরকালে ২৩ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। এই দলে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা এ কে এম শামসুল ইসলাম।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বিমানবন্দরের ভিভিআইপি লাউঞ্জে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, ঢাকায় মালয়েশিয়া ও চীনা মিশনের কূটনীতিক এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিমানবন্দরে সালেহ শিবলী বলেন, অতীতে প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের সময় সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান, ক্ষমতাসীন দলের নেতা এবং সরকারি কর্মকর্তারা বিমানবন্দরে বিদায় জানাতে আসতেন। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় ঘোষিত নতুন প্রটোকল অনুযায়ী, এখন থেকে এ ধরনের উপলক্ষে মন্ত্রিসভার সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবকে বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকতে হবে।
ফ্লাইটটি স্থানীয় সময় রাত পৌনে ৯টায় কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করার কথা রয়েছে। সেখানে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা দিয়ে স্বাগত জানাবে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সফরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ করাই সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
গতকাল (শনিবার) ঢাকায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, সোমবার পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘পারদানা পুত্রা’য় পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হবে।
সেখানে দুই নেতার নেতৃত্বে নিজ নিজ প্রতিনিধিদলের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের আগে তারেক রহমান ও আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যে একটি একান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
পররাষ্ট্র সচিব জানান, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জ্বালানি, হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কৃষি ও শিক্ষা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বৃহত্তর সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা হবে।
বিশেষ করে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন খাতে নতুন বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ, আরও বেশি পেশাজীবী নিয়োগ, বাংলাদেশি কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং তাদের দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর, পারদানা পুত্রায় একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলনের আগে দুই প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের মধ্যে নথিপত্র বিনিময় প্রত্যক্ষ করবেন।
আসাদ আলম সিয়াম আরও বলেন, সাংস্কৃতিক সহযোগিতার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে, এবং একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু করার জন্য মালয়েশিয়ার সঙ্গে একটি ‘টার্মস অব রেফারেন্স’ বিনিময় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন ‘সেরি পারদানা কমপ্লেক্স’-এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন বলেও জানান তিনি।
পররাষ্ট্র সচিব জানান, মালয়েশিয়া সফর শেষ করে তারেক রহমান আগামীকাল (সোমবার) বিকেলে কুয়ালালামপুর থেকে চীনের দালিয়ানের উদ্দেশে রওনা হবেন। সেখানে তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সপ্তদশ বার্ষিক সভায় (যা ‘সামার ডাভোস’ নামে পরিচিত) যোগ দেবেন এবং ধারাবাহিক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চীন সফরকালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি কর্মপরিকল্পনা এবং একটি প্রোটোকলসহ ১৫-১৭টি দ্বিপাক্ষিক দলিল স্বাক্ষরিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর চীনের প্রিমিয়ার লি ছিয়াং এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে।
সরকারপ্রধান হিসেবে নিজের প্রথম বিদেশ সফর শেষ করে আগামী ২৬ জুন তারেক রহমান দেশে ফিরবেন বলে আশা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।