রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন বলেছেন, জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া দেশে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার সব ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
একটি ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, সরকার একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে চলছে। এক্ষেত্রে দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্নীতি দমন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকে নবগঠিত সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘পথ কঠিন হলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই বাধা অতিক্রম অসম্ভব নয়।’ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়ে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক সরকার গঠনের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ করা। তিনি জানান, রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে ইতোমধ্যে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে ঘোষিত ইশতেহারে গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও সুশাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে পূর্বশর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।
দুর্নীতি দমনে অতীত পদক্ষেপের কথা স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিএনপি সরকারই দেশে দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪’ প্রণয়ন করেছিল। বর্তমান সরকারের আমলেও দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে থাকবে।
অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এডিপি প্রণয়নে প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, বেকারত্ব হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সরকার অর্থনীতির ‘অলিগার্কিক’ বা একচেটিয়া কাঠামো ভেঙে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে।
ঋণনির্ভর অর্থনীতিকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর করাই সরকারের মূল লক্ষ্য উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি জানান, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে দেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিকসহ সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত আন্দোলনের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে। এই আন্দোলনে শহিদ ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, সহস্রাধিক মানুষের আত্মত্যাগ ও ৩০ হাজারের বেশি মানুষের আহতের বিনিময়ে এই নতুন বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জন-আস্থা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সেই আস্থা ফিরে আসতে শুরু করেছে। নির্বাচন কমিশনসহ সব প্রতিষ্ঠান যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সরকার তা নিশ্চিত করবে।
পরিশেষে ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’—এই বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন রাষ্ট্রপতি।