আগামী নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করেছেন, সামনের নির্বাচনে নির্ধারিত হবে দেশ উদার গণতান্ত্রিকদের হাতে থাকবে, নাকি উগ্রপন্থি-রাষ্ট্রবিরোধী লোকদের হাতে যাবে। আমাদের অবশ্যই উদারপন্থি রাস্তা বেছে নিতে হবে, গণতান্ত্রিক রাস্তা বেছে নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘অনেকে বলছেন নির্বাচন হবে কিনা, বলছেন বাধা দেবে, নির্বাচন করতে দেবে না...কিন্তু তাদের তিনটা ভোটও নেই। তারাই আবার বড় গলায় কথা বলে। জনগণ যদি আমাদের চায় আমরা থাকব, বাদ দিলে বিরোধী দলে থাকব। তবে আগে থেকেই গলাবাজি কেন?’
তিনি বলেন, ‘আজকে আমাদের এই পরীক্ষাটা খুব কঠিন পরীক্ষা। এই নির্বাচনে নির্ধারিত হবে যে, এই দেশ কি লিবারেল ডেমোক্রেটদের হাতে থাকবে? নাকি আপনার সমস্ত উগ্রপন্থি রাষ্ট্রবিরোধী লোকজনের মধ্যে থাকবে?
‘আমাদের অবশ্যই সেই উদারপন্থি রাস্তা বেছে নিতে হবে, গণতন্ত্রের রাস্তা বেছে নিতে হবে, মানুষের কল্যাণের রাস্তা বেছে নিতে হবে।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘বিএনপি বিপুল ব্যবধানে জয় পাবে, সেজন্য নানা কিছু শুরু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি দুষ্টামি করছে তারা, যারা অতীতে বাংলাদেশকেই স্বীকার করেনি, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেনি, যারা আমাদের মা-বোনদের নির্যাতন করেছে-তুলে নিয়ে গিয়েছিল। সেই হিসাব আমরা ভুলিনি।’
ধর্মের নামে ভোট চাওয়াকে ভণ্ডামি আখ্যা দিয়ে ফখরুল বলেন, ‘রাজনীতি করছেন, রাজনীতি করেন, সিধা রাস্তায় করেন। ধর্মকে ব্যবহার করে, মানুষকে বিভ্রান্ত করে, ভুল বুঝিয়ে নয়।
‘দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে নাকি বেহেশতে যেতে পারবে! চিন্তা করেন। তাহলে আর নামাজ পড়া, আল্লাহর কাছে কমপ্লিট সারেন্ডার (সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ) করা, ঈমান আনা—এগুলো দরকার নাই, নাকি? আমাদের এখানে অনেক উলামা আছেন, তারা বলতে পারবেন।’
সাতচল্লিশ ও একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এরা মুনাফিকি করে মানুষকে ভুল বোঝায়,… তারা এই সমস্ত করে, বরাবর। আজকে না, পাকিস্তান যখন হয় ভারতবর্ষে, যখন স্বাধীন হচ্ছে, যখন যে যার লড়াই করছেন… মুসলমানদের আবাসস্থল পাকিস্তানের জন্য তখন তাদের নেতা মাওলানা মওদুদী আন্দোলন করেননি, বিরোধিতা করেছেন। আজকে বলতে বাধ্য হচ্ছি এসব কথা, কারণ তারা এই কথাগুলো আজকে বিভিন্নভাবে মিথ্যা প্রচার করেন।
‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছেন প্রতিটি মানুষ। তারা (জামায়াত) বিরোধিতা করেছে, ঠিক না? আজকে প্রতিটি মানুষ যখন ভোটের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে, বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের রাজনীতি, তারেক রহমানের নতুন রাজনীতি, আধুনিক রাজনীতি যা বাংলাদেশকে পাল্টে দেবে, তা গ্রহণ করবার জন্য মানুষ উন্মুখ হয়ে আছে, তখন তারা আবার বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে ধর্মের নামে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা ধর্মে বিশ্বাস করি। আমাদের নেতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাহেব, তিনি প্রথম কোরআন শরিফের কথা বলেছেন সংবিধানে। তিনি প্রথম সংবিধানের মধ্যে বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম দিয়েছেন। তিনি প্রথম আল্লাহর উপর অবিচল আস্থা বিশ্বাসের কথা বলেছেন।’
সংস্কার বিষয়ে গণভোটের প্রক্রিয়া নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও অসৎ উদ্দেশ্যের অভিযোগও করেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, ‘অনেকে আমাদের প্রশ্ন করে— আপনারা সংস্কারের পক্ষে না বিপক্ষে? এটা (সংস্কার) তো আমারই সন্তান। আমি তো তার জন্য প্রাণ দিতে পারি। এই যে জিনিসগুলো (প্রশ্ন তোলা) সবসময় বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘সংস্কার প্রস্তাবে সবাই যেখানে একমত হয়েছে, সেখানে অবশ্যই “হ্যাঁ” আছে, সেখানে কোনো না নেই। কিন্তু তারা কারসাজি, বেইমানি করেছে। আমার বলতে কোনো দ্বিধা নেই, যেগুলোতে একমত হইনি সেগুলোও ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে (জুলাই সনদে)। তারপরও আমরা দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে মেনে নিয়েছি। আমাদের কাছে যেটা গ্রহণযোগ্য নয় সেটাও মেনে নিয়েছি, পরে সংসদে গিয়ে দেখা যাবে।’
জিয়াউর রহমানের অবদান তুলে ধরে ফখরুল বলেন, ‘একজন অনন্য নেতা ছিলেন তিনি। তার নেতৃত্বে আলাদা একটা ভূখণ্ড তৈরি হয়েছে এবং স্বাধীন একটা ভূখণ্ড তিনি এই জাতিকে উপহার দিয়েছেন।
‘গত কয়েকদিন আগে আমাদের আরেকজন নেত্রী তার সমস্ত জীবন দিয়ে আমাদের জন্য কাজ করে গেছেন, আমাদের গণতন্ত্রকে মুক্ত করেছেন, আমাদের পথ দেখিয়েছেন, সেই নেত্রীকে আমরা হারিয়েছি। এই দেশের কোটি মানুষ সেদিন সমবেত হয়েছিল ওই পার্লামেন্ট চত্বরে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের নেত্রী যিনি গৃহবধূ ছিলেন, তিনি বাইরে বেরিয়ে এসে জিয়াউর রহমানের সেই পতাকা আবার উপরে তুলে ধরেছেন। এরপর তাদেরই উত্তরসূরী তারেক রহমান, তিনি সেই পতাকা তুলে ধরেছেন।’
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খানসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।