তীব্র জ্বালানি সংকট ও অব্যাহত লোডশেডিংয়ে রংপুর অঞ্চলের জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। একদিকে কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে সেচ সংকটে কৃষিতে দেখা দিয়েছে হাহাকার। পরিবহন খাত অচল হয়ে পড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কারণে অপরাধ প্রবণতা বাড়তে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ।
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ ও তেলের সংকটে কৃষিনির্ভর এ অঞ্চলে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইরি-বোরো মৌসুমে সেচ পাম্পগুলো সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ধান ও ভুট্টাখেতে প্রয়োজনীয় পানি দিতে না পারায় ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন চাষিরা। অনেক খেতে ধানের শীষে চিটা দেখা দিচ্ছে। কৃষকরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব হয়ে পড়বে।
শিল্প খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেড, গাইবান্ধার বিসিক শিল্পনগরীসহ রংপুর বিভাগের মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। উদ্যোক্তারা জানান, ব্যাংক ঋণ নিয়ে গড়া এসব প্রতিষ্ঠান এখন অস্তিত্ব সংকটে। উৎপাদন না থাকলেও শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের দেউলিয়া হওয়ার পথে ঠেলে দিচ্ছে।
শিক্ষা খাতেও চলছে চরম অস্থিরতা। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা জানান, চলমান এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ঠিকমতো প্রস্তুতি নিতে পারছে না। শিক্ষকরা আশঙ্কা করছেন, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পরীক্ষার ফলাফলে। প্রচণ্ড গরমে অনেক শিক্ষার্থী কেন্দ্রে অসুস্থ হয়ে পড়ার খবরও পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন অটোরিকশা ও অটোভ্যানচালকরা। সারা দিন কাজ শেষে গাড়ি চার্জ দেওয়ার মতো বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না তারা। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৪-৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকায় তাদের উপার্জনের পথ বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
রংপুর অঞ্চলের ফিলিং স্টেশনগুলোর চিত্র আরও ভয়াবহ। তেলের পাম্পগুলো ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ পাম্প সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন বন্ধ থাকছে। যে দু-তিন দিন তেল দেওয়া হয়ে থাকে, সেখানেও উপচে পড়া ভিড়। অনেক পাম্পে দেখা দেখা গেছে, তেল দেওয়া শুরুর আগেই দেড় থেকে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। যারা তেল পাচ্ছেন, তা-ও আবার চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত। চাহিদামতো তেল না পাওয়ায় অনেক পাম্পে গ্রাহক-মালিকদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা, মারামারি ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
হিমাগার মালিকদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। আলুসহ পচনশীল পণ্য রক্ষায় ২৪ ঘণ্টা হিমাগার সচল রাখতে হয়। কিন্তু লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর চালানোর মতো প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলও পাওয়া যাচ্ছে না। এতে হিমাগারগুলোতে রাখা কৃষকের হাজার হাজার টন আলু পচে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রংপুর অঞ্চলের বিদ্যুৎ বিভাগের কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, সরকার বলছেন সারা দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। কিন্তু বাস্তবে তেল সংকটের কারণে বিদ্যুতের বেশিরভাগ কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ ও ঠাকুরগাঁও বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে কিছুটা হলেও এই অঞ্চলে চার-পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। অতি দ্রুত চলমান এই জ্বালানি সংকট দূর করতে না পারলে বিদ্যুৎ নিয়ে হাহাকার দেখা দেবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি তেল সংকটের কারণে সবকিছুতেই এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাই কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর না করে জ্বালানির বিকল্প পথ দ্রুত খুঁজে বের করতে হবে। এ সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) জেনারেল ম্যানেজার আশরাফ উদ্দিন খান বলেন, জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে অনেক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারের উচিত দ্রুত বন্ধ কেন্দ্রগুলো চালু করার ব্যবস্থা নেওয়া। জ্বালানি সংকট দূর করতে না পারলে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
রংপুর চেম্বারের পরিচালক প্রণয় কুমার বলেন, জ্বালানি তেলের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে এর প্রভাব পড়েছে মালামাল পরিবহন থেকে শুরু করে সবকিছুতে। এখন ব্যবসায়ীদের প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়াতে হচ্ছে। এতে করে বিপাকে পড়ছেন ক্রেতারা। পাশাপাশি বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের উচিত বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে দ্রুত সব সমস্যার সমাধান করা।
এ বিষয়ে রংপুর জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।