দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হতে চলেছে আজ বৃহস্পতিবার। উন্মুক্ত ব্যালটে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করবেন সংসদ সদস্যরা।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনে মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য ভোট দেওয়ার জন্য যোগ্য বরে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থত জোটের প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং বিরোধী দল জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে সংসদে বিএনপি ও তাদের মিত্রদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিজ দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো প্রার্থীকে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে।
সর্বশেষ সংসদে ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরীকে পরাজিত করে দেশের একাদশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস। সেই নির্বাচনে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট এবং বদরুল হায়দার চৌধুরী ৯২ ভোট পেয়েছিলেন।
এরপর থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একক প্রার্থী থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। প্রতিবারই একজন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
গতকাল (বুধবার) নির্বাচন ভবনে আয়োজিত প্রাক-নির্বাচনী সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনি কর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ১৯৯১ সালের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের ৩৫ বছর পর ভোটগ্রহণ হওয়ায় এবারের নির্বাচনকে ঐতিহাসিক হিসেবে উল্লেখ করেন।
নির্বাচন কমিশন সুন্দরভাবে নির্বাচনটি সম্পন্ন করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুতিতে কোনো ধরনের ঘাটতি নেই।’
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষে সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষেই ভোট গণনা করে তাৎক্ষণিক ফল ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন সিইসি। তিনি বলেন, ভোটের পরে আমরা সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে গণনা শুরু করব। গণনার পরে নির্বাচনি কর্তা হিসেবে আমি যে ফল ঘোষণা করব, সেটাই আইন অনুযায়ী চূড়ান্ত।
এ এম এম নাসির উদ্দিন জানান, ভোট গণনা শেষে সেখানেই (সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে) ফল ঘোষণা করা হবে। এরপর নির্বাচন ভবনে ফিরে ওই দিনই গেজেট প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।
এদিকে, নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠান শুক্রবার সন্ধ্যায় আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বঙ্গভবন।
গত ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। তফসিল অনুযায়ী, ২০ আগস্ট ভোটগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়।
আজ (বৃহস্পতিবার) দুপুরে সংসদে ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার আগে সিইসি ভোটার তথা সংসদ সদস্যদের ভোটদানের পদ্ধতি সম্পর্কে ব্রিফ করবেন।
এ বিষয়ে এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, প্রতিটি ব্যালট পেপারের দুটি অংশ থাকবে—কাউন্টারফয়েল ও ব্যালট অংশ। কাউন্টারফয়েলে ক্রমিক নম্বর, সংসদ সদস্যের নাম ও জাতীয় সংসদ সচিবালয় প্রদত্ত বিভক্তি নম্বর (নির্বাচনি এলাকার নম্বর) এবং একটি খালি জায়গা থাকবে।
ব্যালট পেপার নেওয়ার আগে সংসদ সদস্যকে নির্ধারিত স্থানে তার পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করতে হবে।
ব্যালট পেপারের ডান পাশে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম বাংলায় বর্ণানুক্রমে মুদ্রিত থাকবে। প্রতিটি প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত স্থানে সংসদ সদস্যরা পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করে ভোট দেবেন।
এরপর নির্ধারিত ব্যালট বাক্সে ব্যালট জমা দেবেন সংসদ সদস্যরা। বিকেল ৫টা পর্যন্ত ব্যালট গ্রহণ করা হবে। এরপর ভোট গণনা শুরু হবে।
চট্টগ্রাম-৪ আসনটি শূন্য থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার সংসদ সদস্যের সংখ্যা ৩৪৯ জন।
ভোটারদের মধ্যে বিএনপির ২৪৭ জন, জামায়াতের ৭৭ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আটজন, স্বতন্ত্র আটজন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের তিনজন এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির একজন করে সংসদ সদস্য রয়েছেন।
বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণঅধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলন ক্ষমতাসীন বিএনপির জোটসঙ্গী। সরকারদলীয় জোটের মোট ২৫০ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন, তারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষেই ভোট দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে জামায়াত, এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি ১১ দলীয় বিরোধী দলীয় জোটের অংশ। সংসদে বিরোধী দলীয় জোটে ৯০ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন, যারা অলি আহমদের পক্ষে ভোট দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। এরপর জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের কারণে পদটি শূন্য হলে তা পূরণের জন্য ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হয়।