রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় আদালতে সাক্ষী হিসেবে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন সীমান্ত চন্দ্র দাস নামের এক যুবক। তিনি এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া প্রধান দুই আসামির বন্ধু।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাতে রংপুরের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় সীমান্তর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার আসামিদের দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে সাক্ষী সীমান্তের বর্ণনায় ইয়াবা সেবনের বিষয়ে মিল পাওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ডের রাতে আসামিরা যে সীমান্তের বাসায় ইয়াবা সেবন করেছিলেন, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সে বিষয়টিও উঠে এসেছে।
সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়া সীমান্ত চন্দ্র দাস নগরের মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকার সুবাস চন্দ্র দাসের ছেলে। তিনি গ্রেপ্তার হওয়া আসামি মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের বন্ধু এবং নগরের একটি মার্কেটে কাপড়ের দোকানে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলী বলেন, ‘সাক্ষী হিসেবে সীমান্ত তার বাবার সঙ্গে আদালতে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন। বিচারক ১৬৪ ধারায় তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন।’
তিনি আরও বলেন, সীমান্ত তার জবানবন্দিতে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা আসামিদের দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে মিলেছে। আসামিরা তার বাড়িতে ইয়াবা সেবনের যে তথ্য দিয়েছিলেন, সীমান্তও আদালতে একই কথা জানিয়েছেন।
এর আগে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তারের পর গেল রবিবার সংবাদ সম্মেলনে আরএমপি কমিশনার আবদুল মাবুদ জানিয়েছিলেন, হত্যাকাণ্ডের রাতে ওই দুই আসামি সীমান্তের বাসায় গিয়ে ইয়াবা সেবন করেছিলেন।
এদিকে, আসামিদের ডোপ টেস্ট করা হবে কি না—এ প্রশ্নে তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলী বলেন, ‘ডোপ টেস্টের জন্য সোমবার সকালে ডকেট পেয়েছি। ইতোমধ্যে ডোপ টেস্টের জন্য আবেদন করেছি। বুধবার (আজ) তা চলে যাবে।’
আলোচিত এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের বক্তব্য, তথ্যে অমিলসহ বিভিন্ন বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য ও সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মানুষের মনে থাকা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে খোঁজা হবে। এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে যতগুলো প্রশ্ন আছে, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তার উত্তর খোঁজা হবে। এ মামলায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হবে।’
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গেল রবিবার আরএমপির কোতোয়ালি থানায় নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। ওই দিন রাতে গ্রেপ্তার মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরে তাদের দুজনকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এ মামলায় প্রথমে কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জিকে তদন্ত কর্মকর্তা করা হয়। পরদিন সোমবার মামলার তদন্তভার কোতোয়ালি থানা-পুলিশের কাছ থেকে মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় হস্তান্তর করা হয়। পরে গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক জিন্নাত আলীকে এ মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যান। তিনি নগরীর বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। এরপর নগরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় জমি কিনে সেখানে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। দোতলা বাড়ির নিচতলার কাজ এখনও শেষ হয়নি। প্রায় দুই-তিন বছর ধরে দোতলায় পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন তিনি। অবসরে যাওয়ার পর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে রোগীও দেখতেন গণপতি।
গেল শনিবার রাতে ওই বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণিপড়ুয়া ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার হয়। তাদের সবাইকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে, আরএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত এক স্কুলশিক্ষক, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় আদালতে সাক্ষী হিসেবে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন সীমান্ত চন্দ্র দাস নামের এক যুবক। তিনি এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া প্রধান দুই আসামির বন্ধু।
সনাতন চক্রবর্তী বলেন, হত্যাকাণ্ডের রাতে আসামিরা যে সীমান্তের বাসায় ইয়াবা সেবন করেছিলেন, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সে বিষয়টিও উঠে এসেছে। এতে মামলার এজহার দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। ঘটনার প্রকৃত সত্যতা নিশ্চিত করতে তদন্ত চলমান রয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
এদিকে, গতকাল (মঙ্গলবার) সন্ধ্যায় রংপুরের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করা হয় সীমান্তের। পরে স্বাক্ষীকে পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় রবিবার ভোরে একই এলাকা থেকে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) আটক করা হয়।
ওই দিন বিকেলে নিহত চারজনের মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরের দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের শেষকৃত্য হয়।