গত আগস্ট মাসে দেশে ৫১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮১ জন নিহত এবং ৬৬৪ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৬১ জন নারী ও ৫৮ জন শিশু।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের (আরএসএফ) আগস্ট মাসের সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্টে ১৮৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৭৬ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ৩৬.৫৯ শতাংশ। মোট দুর্ঘটনার ৩৫.৬৭ শতাংশ ছিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা।
এই সময়ে ১০২ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ২১.২০ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৬৭ জন, অর্থাৎ মোট নিহতের ১৩.৯২ শতাংশ। এছাড়া আগস্টে সাতটি নৌ-দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত ও নয়জন আহত হয়েছেন। ৩৪টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ২৭ জন নিহত এবং ২৩ জন আহত হয়েছেন।
আরএসএফ ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
দুর্ঘটনায় যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১৭৬ জন (৩৬.৫৯ শতাংশ), বাসের যাত্রী ৩৭ জন (৭.৬৯ শতাংশ), ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রাক্টর-লরি-ড্রাম ট্রাকের আরোহী ৫১ জন (১০.৬০ শতাংশ), মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-জিপের আরোহী ১১ জন (২.২৮ শতাংশ) নিহত হয়েছেন।
এছাড়া থ্রি-হুইলার যাত্রী—অটোরিকশা, অটোভ্যান, ইজিবাইক, সিএনজি ও লেগুনা—নিহত হয়েছেন ৭৮ জন (১৬.২১ শতাংশ)। স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের—নসিমন, ভটভটি ও মাহিন্দ্র—যাত্রী নিহত হয়েছেন ২১ জন (৪.৩৬ শতাংশ)। রিকশা ও বাইসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন পাঁচজন (১.০৩ শতাংশ)।
আরএসএফের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ১৬৩টি (৩১.৭৭ শতাংশ) জাতীয় মহাসড়কে, ২১৭টি (৪২.৩০ শতাংশ) আঞ্চলিক সড়কে, ৬২টি (১২.০৮ শতাংশ) গ্রামীণ সড়কে এবং ৭১টি (১৩.৮৪ শতাংশ) শহরের সড়কে সংঘটিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্টে দুর্ঘটনায় মোট ৭৪৯টি যানবাহন সম্পৃক্ত ছিল। এর মধ্যে বাস ১০৩টি, ট্রাক ১০৮টি, কাভার্ডভ্যান ৩৬টি, পিকআপ ৩২টি, ট্রাক্টর আটটি, ট্রলি ছয়টি, লরি ১২টি, ড্রাম ট্রাক ১০টি, তেলবাহী ট্রাক একটি, ১৪ চাকার লরি একটি, মাইক্রোবাস ১৪টি, প্রাইভেটকার ২০টি, অ্যাম্বুলেন্স আটটি, জিপ চারটি, মোটরসাইকেল ১৯৪টি, থ্রি-হুইলার ১১২টি, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন ৩৬টি, রিকশা আটটি, বাইসাইকেল পাঁচটি এবং অজ্ঞাত যানবাহন ৩১টি।
থ্রি-হুইলারের মধ্যে অটোরিকশা, অটোভ্যান, ইজিবাইক, সিএনজি ও লেগুনা এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের মধ্যে নসিমন, ভটভটি, আলমসাধু, টমটম ও মাহিন্দ্র রয়েছে।
সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগস্টে সংঘটিত দুর্ঘটনার ৮ শতাংশ ভোরে, ২৭.৮৭ শতাংশ সকালে, ১৮.৯০ শতাংশ দুপুরে, ১৫.২০ শতাংশ বিকালে, ৯.৯৪ শতাংশ সন্ধ্যায় এবং ২০.০৭ শতাংশ রাতে ঘটেছে।
বিভাগভিত্তিক চিত্র
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে মোট দুর্ঘটনার ৩৩.৫২ শতাংশ এবং প্রাণহানির ২৯.৯৩ শতাংশ ঘটেছে। রাজশাহী বিভাগে দুর্ঘটনা ১৪.৮১ শতাংশ ও প্রাণহানি ১৮.৫০ শতাংশ, চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা ১৭.৩৪ শতাংশ ও প্রাণহানি ১৫.৫৯ শতাংশ, খুলনা বিভাগে দুর্ঘটনা ৯.৯৪ শতাংশ ও প্রাণহানি ৮.৭৩ শতাংশ।
বরিশাল বিভাগে দুর্ঘটনা ২.৯২ শতাংশ ও প্রাণহানি ২.৯১ শতাংশ, সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা ৫.০৬ শতাংশ ও প্রাণহানি ৭.৬৯ শতাংশ, রংপুর বিভাগে দুর্ঘটনা ১০.৫২ শতাংশ ও প্রাণহানি ১০.৮১ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুর্ঘটনা ৫.৮৪ শতাংশ ও প্রাণহানি ৫.৮২ শতাংশ।
ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১৭২টি দুর্ঘটনায় ১৪৪ জন নিহত হয়েছেন। বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে কম ১৫টি দুর্ঘটনায় ১৪ জন নিহত হয়েছেন। একক জেলা হিসেবে বগুড়ায় সবচেয়ে বেশি ৩৭ জন নিহত হয়েছেন।
রাজধানী ঢাকায় আগস্টে ৪৮টি দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত এবং ৫৪ জন আহত হয়েছেন।
জুলাইয়ের তুলনায় প্রাণহানি বেড়েছে
আরএসএফের পর্যালোচনায় বলা হয়, গত জুলাই মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ১৩.৪১ জন নিহত হয়েছিলেন। আগস্টে প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছেন ১৫.৫১ জন। এ হিসাবে আগস্টে প্রাণহানি বেড়েছে ১৫.৬৫ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে অতিরিক্ত গতির কারণে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। এ গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি এবং চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
যানবাহনের বেপরোয়া গতি এবং পথচারীদের অসচেতনতার কারণে পথচারী নিহতের ঘটনাও বাড়ছে বলে উল্লেখ করে আরএসএফ। এজন্য সরকারি উদ্যোগে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে জীবনমুখী সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
দুর্ঘটনার প্রধান কারণ
আরএসএফের প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা এবং মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া তরুণ-যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকেও দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
১১ দফা সুপারিশ
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল (এনআরএসসি) পুনর্গঠন করে এর অধীনে বিআরটিএ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) এবং ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) পরিচালনার সুপারিশ করেছে আরএসএফ। কাউন্সিলের হাতে আইন, বিধি ও নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
সংস্থাটি বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং এসব কারিগরি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের নিয়োগের সুপারিশ করেছে।
মোটরযানে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং সড়ক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহারের কথাও বলা হয়েছে।
রাজধানীতে রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাস সার্ভিস চালু, বিআরটিসির বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি ও পরিবহন সেবা উন্নত করে সরকারের পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে আরএসএফ।
দক্ষ চালক তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বৃদ্ধি করে তাদের বেতন, কর্মঘণ্টা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং স্বল্পগতির ছোট যানবাহনের জন্য সব মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণসহ নিরাপদ রোড ডিজাইনের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়াও সব রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ, সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা ও দক্ষতা বাড়াতে জাতীয় বাজেটে অর্থ বরাদ্দ এবং প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, টেকসই পরিবহন কৌশলের অধীনে সড়ক, রেল ও নৌ-পরিবহন একত্রিত করে একটি অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠন করা হলে সমন্বিত, পরিকল্পিত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
আরএসএফ বলেছে, সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ‘অতীব জরুরি’।