এবারের ঈদুল ফিতরের আগে-পরে ১৫ দিনে দেশে ৩৭৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯৮ জন নিহত হয়েছেন, যা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ জন। একই সময়ে আহত হয়েছেন দুই হাজারের বেশি মানুষ।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পাঠানো এ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনটি জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল (পঙ্গু হাসপাতাল), ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৪ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত সময়ে নিহতদের মধ্যে ৪৬ জন নারী ও ৬৭ জন শিশু রয়েছে।
যানবাহনভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ১১৬ জন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন, যা মোট প্রাণহানির ৩৮ দশমিক ৯২ শতাংশ। এছাড়া ৪৭ জন পথচারী (১৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ), বাস যাত্রী ৪১ জন (১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ) ট্রাক-পিকআপ আরোহী ১৩ জন (৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ), প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস আরোহী ২০ জন (৬ দশমিক ৭১ শতাংশ), থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান) ৫০ জন (১৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন-ভটভটি-মাহিন্দ্র-টমটম) ৯ জন (৩ দশমিক ০২ শতাংশ) এবং বাইসাইকেলআরোহী ২ জন (.৬৭ শতাংশ) নিহত হয়েছেন।
এ সময় ১১টি নৌ দুর্ঘটনায় ৯ জন নিহত, ২৩ জন আহত ও ২ জন নিখোঁজ এবং ২৯টি রেল দুর্ঘটনায় ৪১ জন নিহত ও ২০৯ জন আহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ৩০ দশমিক ৮৩ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৪৩ দশমিক ১৬ শতাংশ আঞ্চলিক সড়কে, ১২ দশমিক ৮৬ শতাংশ গ্রামীণ সড়কে এবং ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ শহরের সড়কে ঘটেছে।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪০ দশমিক ৭৫ শতাংশ দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ২৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ সংঘর্ষে এবং ১৩ দশমিক ১৩ শতাংশ পথচারীকে চাপা দেওয়ার ঘটনায় ঘটেছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। এ অঞ্চলে ৯৩টি দুর্ঘটনায় ৭৪ জন নিহত হয়েছেন। অপরদিকে, বরিশাল বিভাগে সর্বনিম্ন ১২ জন নিহত হয়েছেন। জেলা হিসেবে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ৪৩টি দুর্ঘটনায় ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এবারের ঈদে রাজধানী ঢাকা থেকে এক কোটির বেশি মানুষ বাড়ি ফিরেছেন এবং সারাদেশে প্রায় চার কোটি মানুষ যাতায়াত করেছেন। ছুটি দীর্ঘ হওয়ায় যাত্রীচাপ তুলনামূলক কম থাকলেও অব্যবস্থাপনার কারণে সড়ক, রেল ও নৌপথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
কয়েকটি বড় দুর্ঘটনার মধ্যে রয়েছে— সদরঘাটে দুই লঞ্চের মাঝে চাপা পড়ে দুইজন নিহত, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে সেতু উল্টে চার শিশু নিহত, কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে রেলক্রসিংয়ে বাস-ট্রেন সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত এবং দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাস নদীতে পড়ে ২৬ জন নিহত। এসব ঘটনাকে প্রতিবেদনে ‘কাঠামোগত ব্যর্থতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৫ সালের একই সময়ে ১১ দিনে ২৫৭টি দুর্ঘটনায় ২৪৯ জন নিহত হয়েছিলেন। সে তুলনায় এ বছর দুর্ঘটনা বেড়েছে ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ, তবে প্রাণহানি কমেছে ১২ দশমিক ২৪ শতাংশ। তবে এই হ্রাসকে প্রকৃত উন্নতির সূচক নয় বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, চালকের অদক্ষতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ মোটরসাইকেল চালনাকে দায়ী করা হয়েছে।
সংস্থাটি নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা গ্রহণ, রেল ও নৌপথ উন্নয়ন, গণপরিবহন বাড়ানো, দক্ষ চালক তৈরি এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের সুপারিশ করেছে।