একটি স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনকে টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের পূর্বশর্ত উল্লেখ করে স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক সংস্কার ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা জিডিপির ১ দশমিক ০১ শতাংশ।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ ঘোষণা দেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীতে স্বাস্থ্য খাতে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ ও উপকরণ ক্রয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও দুর্নীতির কারণে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন হয়নি। ফলে দেশের হাসপাতালগুলো অতিরিক্ত রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে, সাধারণ মানুষ মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ায় মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকারের স্বাস্থ্যনীতির মূল লক্ষ্য হবে সর্বজনীন ও ন্যায়সঙ্গত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, চিকিৎসাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে প্রতিরোধকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রূপান্তর, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি ও টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ও চিকিৎসা শিল্পের বিকাশ ঘটানো।
সরকার স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ ধাপে ধাপে বাড়িয়ে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বলেও জানান তিনি।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় প্রত্যেক নাগরিককে জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করে আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’ দেওয়া হবে।
জটিল রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা সহজলভ্য ও সুশৃঙ্খল করতে প্রতিটি জেলা হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে সমন্বিতভাবে পূর্ণাঙ্গ ‘সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি মা, নবজাতক, শিশু ও প্রজননস্বাস্থ্যসেবা এবং ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা থাকবে। অন্যদিকে, সার্জারিসহ জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসা জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে কেন্দ্রীভূত করা হবে, যেখানে করোনারি কেয়ার ও কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিটের মতো সুবিধাও থাকবে।
রোগী পরিবহনের দুর্ভোগ কমাতে ‘জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক’ গঠনের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার একটি সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও আধুনিক জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচি প্রণয়নে কাজ করছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের খর্বাকৃতির সমস্যা মোকাবিলায় বহুমুখী ও বহু-খাতভিত্তিক জাতীয় কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হবে।
ওষুধশিল্পের বিকাশে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) শিল্পপার্কসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, গবেষণা, বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখা হবে। এলডিসি উত্তররণের পরিপ্রেক্ষিতে ওষুধশিল্পের ধারাবাহিক উন্নয়ন, উদ্ভাবন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে আর্থিক প্রণোদনা ও সহায়ক নীতিগত সুবিধা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে দেশব্যাপী একটি আধুনিক ও টেকসই ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে।
হামের প্রাদুর্ভাব প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, টিকা সংগ্রহ ও টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নে অতীতের অবহেলা ও পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে দেশে হামের বিস্তার ঘটেছে এবং শিশু মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই প্রায় শতভাগ শিশুকে হাম-রুবেলা টিকা প্রদানের কার্যক্রম সম্পন্ন করছে।
চিকিৎসাশিক্ষার আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ইন্টিগ্রেটেড মডুলার পদ্ধতি, আধুনিক ক্লিনিক্যাল শিক্ষাব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চিকিৎসা জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করে নতুন দক্ষতাভিত্তিক এমবিবিএস কারিকুলাম চালু করা হবে।
জনবল সংকট নিরসনে অবিলম্বে ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নার্সিং ও মিডওয়াইফারি খাতে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। দেশব্যাপী মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন করে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যার ৮০ শতাংশ নারী হবে।
শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে চার মাস মেয়াদি ‘জেনারেল কেয়ারগিভার’ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর কথাও ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি চিকিৎসা সরঞ্জাম ও মেডিকেল ডিভাইস শিল্পকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শিল্পখাত হিসেবে উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সীমিত আয়ের মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা কমানো, মানসম্মত ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রতিষ্ঠাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা, যা ছিল জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ।