জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়লেও কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে তার কোনো প্রতিফলন নেই। এখানে ভোট নয়, মানুষের প্রধান ভাবনা—আগামী বছর বসতভিটা থাকবে তো? অসুস্থ হলে শহরে কি পৌঁছানো যাবে? সংসার চলবে কীভাবে আর সন্তানরা আদৌ শিক্ষার আলো পাবে কি?
ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের কালির আলগা, গোয়াইলপুরী, পূর্ব ঝুনকা, অষ্টআশির চর, চিড়া খাওয়া, খেয়ারচরসহ প্রায় ২০টি চরে বসবাসরত প্রায় ৫ হাজার ২০০ ভোটারের মধ্যে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তেমন কোনো আগ্রহ নেই। অনেকেই জানেন না ‘হ্যাঁ’ ভোট বা ‘না’ ভোট কী; এমনকি ভোটের প্রক্রিয়া সম্পর্কেও তাদের স্পষ্ট ধারণা নেই।
চরাঞ্চলের মানুষের জীবন নদীনির্ভর ও অনিশ্চিত। ১৯৫০ সাল থেকে অব্যাহত নদীভাঙনের ফলে এসব চর সৃষ্টি হয়েছে। প্রতি বছর বর্ষায় নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও যোগাযোগব্যবস্থা।
কালির আলগা চরের বাসিন্দা জামাল বলেন, ‘ভোট দিয়ে কী হবে? নদী আইলে আইলে ভাঙে। আজ ঘর আছে, কাল নাই—এই চিন্তায় ভোট মনে আসে না।’
গোয়াইলপুরী চরের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, ভোটের সময় কেউ আসে না। আর এলেও ভোট শেষ হলে আর খোঁজ থাকে না। তাই ভোট নিয়ে ভাবার সময় আমাদের নেই।
চরাঞ্চলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও শিক্ষক নিয়মিত না যাওয়ায় শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। পূর্ব ঝুনকা চরের এক অভিভাবক বলেন, ‘স্কুল আছে, কিন্তু মাসে কয়দিন শিক্ষক আসেন, কেউ জানে না।’ বাচ্চারা পড়ালেখা থেকে পিছিয়ে পড়ছে বলে শঙ্কিত তিনি।
স্বাস্থ্যসেবার অবস্থাও নাজুক। স্থায়ী কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। চিড়া খাওয়া চরের গৃহিণী রোকেয়া বেগম বলেন, অসুখ হলে নৌকা পাওয়াই মুশকিল। শহরে যেতে যেতে অনেক সময় চলে যায়। এই অবস্থায় ভোটের কথা ভাববে কে?
চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের কুড়িগ্রাম জেলা সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, ‘শুধু যাত্রাপুর ইউনিয়ন নয়, কুড়িগ্রাম জেলায় ১৬টি নদ-নদীবেষ্টিত চর ও দ্বীপচর মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৮০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ৪৬৯টি চর রয়েছে। এর মধ্যে ২৬৯টি চরে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ বসবাস করছে। এসব চরে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ বলতে কার্যত কিছুই নেই।’
তিনি বলেন, ‘এর আগে রাজনৈতিক নেতারা যে আশ্বাস দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় তাদের ওপর আস্থা হারিয়েছে চরবাসী। ফলে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে মানুষের আগ্রহ খুবই কম।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অধ্যাপক লিয়াকত আলী বলেন, ‘দারিদ্র্যের দিক থেকে ৬৪ জেলার মধ্যে কুড়িগ্রাম প্রায় তলানিতে অবস্থান করছে। ২৩ লাখ ২৯ হাজার মানুষের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৬ লাখ মানুষ দরিদ্র। চরাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার আরও বেশি।’
তিনি বলেন, ‘গত পতিত সরকার নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করায় শুধু চরাঞ্চল নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও ভোটের প্রতি অনীহা তৈরি হয়েছে। আমার হিসেবে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার নীরব অবস্থানে রয়েছেন। ফলে এবারের নির্বাচন অত্যন্ত জটিল। কোন প্রার্থী জয়ী হবে, তা অনুমান করা কঠিন।’
চরবাসীদের অভিযোগ, নির্বাচনের সময় প্রার্থীদের তেমন আনাগোনা নেই। প্রচারণা শহর ও মূল ভূখণ্ডেই কেন্দ্রীভূত থাকে। চরগুলো এসব কার্যক্রম থেকে কার্যত উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
খেয়ারচরের যুবক আল আমিন বলেন, ‘ভোটের জন্য কেউ আসে না, বোঝায় না। উন্নয়ন না হলে ভোটে আগ্রহ আসবে কীভাবে?’
চরবাসীরা বলছেন, তারা ভোটের বিরোধী নন। তবে ভোটের আগে নয়, ভোটের পর বাস্তব উন্নয়ন দেখতে চান। নদীভাঙন রোধ, স্থায়ী যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হলেই ভোটের গুরুত্ব তাদের কাছে নতুনভাবে ধরা দেবে। তাদের একটাই দাবি, ভোটের আগে চাই বাঁচার নিশ্চয়তা; উন্নয়ন এলে ভোট আপনাতেই গুরুত্ব পাবে।