মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেওয়ার পর ওয়াশিংটনে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে—এ হামলার আগে হোয়াইট হাউসের কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া প্রয়োজন ছিল কিনা!
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ভোরে ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে যুক্তরাষ্ট্র ‘এপিক ফিউরি’ নামে ব্যাপক আকারের বিমান হামলা শুরু করে। অপরদিকে, ইসরায়েল তাদের অভিযানকে ‘লায়নস র্যোর’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার দুই দিন পর এ হামলা হয় এবং এরপর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের পাল্টা হামলা দেখা যায়।
মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। তবে এই ক্ষেত্রে কংগ্রেস যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। একইসঙ্গে সংবিধানের কিছু বিধান প্রেসিডেন্টকে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিস্তৃত ক্ষমতা দেয়, যা দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের একটি ধূসর ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
ক্যাপিটল হিলে প্রতিক্রিয়া মূলত দলীয় বিভাজন অনুযায়ী এসেছে। বর্তমানে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণে থাকা রিপাবলিকানরা বেশিরভাগই হামলাকে সমর্থন দিয়েছেন।
স্পিকার মাইক জনসন জানান, অভিযানের আগে প্রশাসন ‘গ্যাং অব এইট’ নামে পরিচিত উভয় দলের জ্যেষ্ঠ কংগ্রেস নেতাদের একটি গোষ্ঠীকে ব্রিফ করেছিল।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই তিনি যুদ্ধ শুরু করেছেন। তারা অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্টের সামরিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা সীমিত করতে ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজল্যুশন’ আনার আহ্বান জানান। অবশ্য রিপাবলিকানদের সীমিত সমর্থনের কারণে তা পাস হওয়ার সম্ভাবনা কম।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতে তিনজন মার্কিন সেনা নিহত এবং পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশজুড়ে বিমান হামলায় ২০০ জনের বেশি নিহত এবং ৭০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের একটি স্কুলে বিস্ফোরণে অন্তত ১৫৩ জন নিহত হয়েছে, যাদের অনেকেই শিশু।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলীয় শহর বেইত শেমেশে অন্তত নয়জন নিহত হয়েছে এবং তেল আবিবেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানিয়েছে।
এছাড়া বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ও মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরান। আবুধাবি ও দুবাই বিমানবন্দরেও হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।
ট্রাম্প হামলার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করছে, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে হামলা পরিচালনা করছে। তিনি ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল এবং ১৯৮৩ সালে বৈরুতে মার্কিন মেরিন ব্যারাকে বোমা হামলার ঘটনাকেও সামরিক পদক্ষেপের যৌক্তিকতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
এই সংঘাতে ইতোমধ্যে ইরানের শীর্ষ নেতারা প্রাণ হারিয়েছেন। ট্রাম্প দাবি করেন, হামলায় সর্বোচ্চ নেতা খামেনি নিহত হয়েছেন—যা পরে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করে এবং ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে।
ট্রাম্প আরও বলেন, অভিযানে ইরানের ১০-১২ জন জ্যেষ্ঠ নেতাকে নির্মূল করা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানে স্থলবাহিনী মোতায়েনের কোনো পরিকল্পনা নেই। এর বদলে অভিযানটি দীর্ঘমেয়াদি বিমান ও নৌ-অভিযানের ওপর নির্ভর করবে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের দশ হাজারের মতো সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং ওই অঞ্চলে দুটি বিমানবাহী রণতরী পাঠানো হয়েছে।
ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে—এ অভিযোগ অস্বীকার করলেও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ এখনও তীব্র। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলছে, জরুরি হুমকি দূর করতেই এই অভিযান চালানো হচ্ছে। এদিকে ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ ক্ষমতার সীমা ও সামরিক অভিযানে কংগ্রেসের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।